দীর্ঘ প্রতীক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের খসড়া আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হচ্ছে। এর আগে সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এই বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আজ বিকেল ৫টায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে।
সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ানোর এই প্রস্তাব আসছে দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে। নবম জাতীয় বেতন কমিশন গত বছর জুলাই মাসে তাদের সুপারিশ জমা দেয়। কমিশন ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছিল। বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ। তবে কমিশনের পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় সচিব কমিটি মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশের মধ্যে রাখার সুপারিশ করেছে।
গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। তাদের দায়িত্ব ছিল বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং বাস্তবায়নের কৌশল বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করা। প্রায় চার মাস পর্যালোচনার পর কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে শুধু মূল বেতন কার্যকর হবে। পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতভাতা কার্যকর করা হবে। প্রথম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না; গ্রেডভেদে কিছুটা কমবেশি থাকবে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ১ম গ্রেডে মূল বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২য় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪র্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। নিম্ন গ্রেডগুলোর বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে।
নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন কবে আসছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং শেষে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। যদিও গেজেট প্রকাশে সাময়িক বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসের বকেয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করা হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাদের জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, যা সরকার ধাপে ধাপে মেটানোর পরিকল্পনা করছে।
মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় অনেকটা কমে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগটি সময়োপযোগী। তবে বাস্তবায়নের ধাপ, অর্থায়নের উৎস এবং গেজেট প্রকাশের সময়সীমা, এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকই হয়তো এই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।

