সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার কদমতলী এলাকায় প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘মুক্তিযোদ্ধা চত্বর’-এর মূল অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে প্রায় চোদ্দ মাস আগে। কিন্তু এখনো বৈদ্যুতিক বাতি না লাগানোয় স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভাস্কর্যের নকশাকারী প্রতিষ্ঠান যে ধরনের বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার পরামর্শ দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে প্রায় ৭০-৭৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে অনাগ্রহী সিটি করপোরেশন। তাই বিকল্প হিসেবে মাত্র তেরো-চৌদ্দ লাখ টাকা খরচে সাধারণ বাতি লাগিয়েই দ্রুত চত্বরটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ।
এত দীর্ঘ সময় ধরে বৈদ্যুতিক ও আলোকসজ্জার কাজ অসম্পূর্ণ রেখে স্থাপনাটি ফেলে রাখার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রকল্পের প্রধান স্থপতি। তার ভাষ্যমতে, বৈদ্যুতিক ও আলোকসজ্জা খাতে বড়জোর ৪০-৪৫ লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা, অথচ সিটি করপোরেশন কেন এই খরচকে ৭০-৭৫ লাখ টাকা বলে দেখাচ্ছে, তা তার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিকল্পিত নকশার বদলে সাধারণ বাতি বসানো হলে পুরো স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্য একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে।
কদমতলী এলাকায় প্রায় দশ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই চত্বরের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের বছরের ডিসেম্বরেই কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় কয়েক দফা সময়সীমা বাড়াতে হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের জুনে মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও বৈদ্যুতিক সংযোগের অভাবে তা এখনো ব্যবহারের অযোগ্য থেকে গেছে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, নকশা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক কাজ করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা বরাদ্দ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তুলনামূলক কম খরচে সাধারণ বাতি স্থাপন করে দ্রুততম সময়ে চত্বরটি উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বছরের আগস্টে এ সংক্রান্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া শেষে সেপ্টেম্বর মাসেই কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালে এই কদমতলী এলাকাতেই পাকিস্তানি সেনারা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। ইতিহাসের এই তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতিকে ধরে রাখতেই এখানে ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন।
প্রকল্পের নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা দলে রয়েছেন একাধিক স্থপতি ও প্রকৌশলী, যারা কাঠামো ও বৈদ্যুতিক নকশা যৌথভাবে প্রণয়ন করেছেন। নকশা অনুযায়ী, স্থাপনাটির কেন্দ্রীয় অংশে একাত্তরের স্মৃতিকে ধারণ করে তৈরি হয়েছে ৭১ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তের ওপর সমপরিমাণ উচ্চতার চার বাহুবিশিষ্ট একটি স্তম্ভ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে স্তম্ভে বসানো হয়েছে বায়ান্নটি রিং, যা পরবর্তীতে লাল রঙে রাঙানো হবে। এ ছাড়া তৎকালীন সিলেট বিভাগের চার মহকুমার সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের প্রতীক হিসেবে চারটি বেয়নেট এবং চার দিক থেকে কেন্দ্রমুখী চারটি প্রতীকী রাইফেলও অবকাঠামোতে যুক্ত করা হয়েছে।
নকশা-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দিনের বেলা রাইফেলের অংশগুলো ধূসর রঙে দৃশ্যমান থাকবে, আর রাতে বিশেষ কৌণিক আলো দিয়ে সূক্ষ্মভাবে আলোকিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সেগুলো। পাশাপাশি লাল রঙের সিলিন্ডার-আকৃতির অংশে বিশেষ এলইডি আলো ফেলার এবং সিলিন্ডারের শীর্ষ থেকে আকাশমুখী লেজার রশ্মি বিচ্ছুরণের নকশাও করা হয়েছে। এই সামগ্রিক আলোকবিন্যাসের মূল উদ্দেশ্য প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তোলা—মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার আলো আজও গোটা জাতির পথ দেখাচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অবকাঠামো তৈরি করে দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখার বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। দ্রুত এই কাজ সম্পন্ন করতে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিস্থাপনা কেবল কয়েক লাখ টাকার আলোকসজ্জার অভাবে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার এই ঘটনা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার ও পরিকল্পনার ঘাটতিরই একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে মতপার্থক্য দ্রুত না মিটলে মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিসৌধ আরও কতদিন অন্ধকারে পড়ে থাকবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

