কারখানা বন্ধের প্রভাব শ্রমিকের ঘর থেকে রূপগঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতিতে; বদলে গেছে টায়ারের বাজারও
একসময় সকাল হলেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী ও কর্ণগোপ এলাকা। হাজার হাজার শ্রমিক ছুটতেন কারখানার দিকে। তাদের ঘিরে চলত দোকানপাট, চায়ের আড্ডা, রিকশা-ভ্যান, বাসাবাড়ির ভাড়া—সবকিছু। এখন সেই ব্যস্ততা নেই।
গাজী টায়ারসের দুটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রায় দুই বছর পরও সেখানে উৎপাদন শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর বন্ধ হয়ে যায় কারখানাগুলো। এরপর বদলে গেছে শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেহারা নয়, বদলে গেছে এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজারো মানুষের জীবনও।
গাজী গ্রুপের রূপসী ও কর্ণগোপের দুই কারখানায় কাজ করতেন ৭ হাজার ২৩০ জন শ্রমিক। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তাদের অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। কেউ নতুন চাকরি নিয়েছেন, কেউ কম আয়ের পেশায় গেছেন, আবার কেউ গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজ বা ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
শেরপুরের মো. ইপন গাজী ছিলেন তাদেরই একজন। প্রায় আট বছর গাজী টায়ারসে কাজ করেছেন তিনি। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর একটি ভোগ্যপণ্য তৈরির কারখানায় চাকরি নিলেও আগের তুলনায় আয় কমে যায়। শেষ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হয় তাকে।
তার মতো অনেক শ্রমিকের কাছেই গাজী টায়ারস ছিল শুধু একটি চাকরি নয়—ছিল সংসারের নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা।
তিন বছর এই কারখানায় কাজ করেছিলেন রহমত আলী। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তিনি শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সম্প্রতি আবার কারখানার সামনে এসেছিলেন। ভেতরের অবস্থা দেখতে চেয়েছিলেন। কারখানা খুললে আবার এখানে চাকরিতে ফিরতে চান তিনি।

একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু শ্রমিকের আয় বন্ধ হয় না
গাজী টায়ারসের কারখানাকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জে গড়ে উঠেছিল একটি বড় স্থানীয় অর্থনীতি। শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে চলত ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসা।
রূপসী বাজারের দোকানি মো. রাজুর কাছে সেই পরিবর্তন খুবই স্পষ্ট। আগে কারখানার শ্রমিকদের ভিড়ে জমজমাট থাকত দোকানপাট। এখন ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম।
খাদুন সড়কের চা দোকানি মেহরাব হোসেনের হিসাবে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তার দোকানের বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।
কারখানার শ্রমিকেরা শুধু তার দোকানের ক্রেতা ছিলেন না। তারা ছিলেন আশপাশের মুদি দোকান, খাবারের দোকান, পরিবহন, বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন ছোট ব্যবসারও প্রধান গ্রাহক।
ফলে কারখানার দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির অনেক দরজাও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়েছে।
ছয় ঘণ্টার আয় করতে এখন লাগে ১২ ঘণ্টা
কারখানার শ্রমিকদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পরিবহনকর্মীরাও।
ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক সুমন ইসলাম জানান, আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে যে পরিমাণ আয় করতে পারতেন, এখন তা করতে প্রায় ১২ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হয়।
কারণ আগের মতো যাত্রী নেই।
কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিকশাচালকদের নিয়মিত যাত্রীও কমে গেছে।
রফিকুল ইসলামের গল্প আরও কঠিন। ৫৭ বছর বয়সে তাকে আবার রিকশা চালাতে হচ্ছে। তার ছেলে মনির হোসেন গাজী টায়ারসে কাজ করতেন। ছেলের উপার্জনের ওপরই নির্ভর করত পরিবারের অনেকটা।
চাকরি হারানোর পর বাবাকেই আবার রাস্তায় নামতে হয়েছে।
তবু রফিকুলের আশা, কারখানা আবার চালু হলে তার ছেলে ফিরে পাবেন পুরোনো চাকরি।
বদলে গেছে টায়ারের বাজার
গাজী টায়ারসের কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের টায়ারের বাজারেও।
একসময় দেশের টায়ারের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করত গাজী টায়ারস। রূপসী ও কর্ণগোপের কারখানার বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
কারখানা বন্ধ থাকায় বাজার অবশ্য থেমে থাকেনি। গাজীর জায়গা নিয়েছে অন্যান্য ব্র্যান্ড।
স্থানীয় বিক্রেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মেঘনা, আরএফএল, আকিজসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড এখন বাজারে বেশি জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘদিন গাজী টায়ার ব্যবহার করা অনেক ক্রেতাও অন্য ব্র্যান্ডের দিকে চলে গেছেন।
ফলে কারখানা পুনরায় চালু হলেও আগের বাজার ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না—এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
দুই কারখানায় ক্ষতি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা
গাজী গ্রুপের এক কর্মকর্তার হিসাবে, হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপগঞ্জের দুই কারখানায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তবে এই ক্ষতির পুরো হিসাব শুধু অর্থ দিয়ে করা সম্ভব নয়।
কারখানার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের হারানো আয়, দোকানিদের কমে যাওয়া বিক্রি, রিকশাচালকদের কমে যাওয়া যাত্রী এবং আশপাশের বাসাবাড়ির ভাড়াটিয়া কমে যাওয়ার প্রভাবও ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ১৮২ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছর পরও তাদের অনেকের কোনো সন্ধান মেলেনি। ফলে কিছু পরিবারের অপেক্ষাও শেষ হয়নি।
আবার চালুর চেষ্টা, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
গাজী গ্রুপ জানিয়েছে, তারা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে চায়। সরকারের কাছ থেকে নীতিগত সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকগুলোর সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে।
তবে বীমাসহ কিছু জটিলতা এখনো রয়েছে। ফলে কবে নাগাদ উৎপাদন শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকার সময় বাজারের চিত্র বদলে গেছে। শ্রমিকেরা ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন পেশা ও এলাকায়। স্থানীয় ব্যবসাগুলোও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পোড়া ভবনের সামনে এখনও অপেক্ষা

একটি কারখানা শুধু মেশিন, ভবন আর উৎপাদন লাইনের সমষ্টি নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবিকা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং একটি এলাকার অর্থনীতি।
গাজী টায়ারসের কারখানার পোড়া দেয়ালগুলো সেই গল্পই বলছে। কারও কাছে এটি হারানো চাকরির স্মৃতি।
কারও কাছে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানের হিসাব। কারও কাছে কমে যাওয়া রিকশার যাত্রী। আর কারও কাছে পরিবারের একজন মানুষের ফিরে আসার অপেক্ষা। দুই বছর ধরে কারখানার চাকা থেমে আছে।
কিন্তু সেই চাকা আবার ঘুরবে কি না—তার অপেক্ষায় এখনো রয়েছেন অনেক মানুষ।

