দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর আজ থেকে পর্যটকদের জন্য আবার উন্মুক্ত হলো সুন্দরবন। তবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনে ভ্রমণে যাওয়ার আগে সঠিক পরিকল্পনা এবং অভিজ্ঞ ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যারা শিগগিরই সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য থাকছে জরুরি কিছু তথ্য ও পরামর্শ।
সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য মূলত তিনটি পথ ব্যবহার করা যায়—খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর। তবে লঞ্চ বা জাহাজে করে যেতে চাইলে খুলনা বা মোংলা থেকেই যাত্রা শুরু করতে হবে। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে খুলনা ও মোংলায় যাওয়া যায়—নন-এসি বাসে খুলনার ভাড়া পড়ে সাতশ থেকে আটশ টাকার মধ্যে, আর এসি বাসে তা দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। মোংলাগামী নন-এসি বাসের ভাড়া সাতশ টাকার কাছাকাছি। এ ছাড়া ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি ট্রেনও চলাচল করে।
মনে রাখা জরুরি, সুন্দরবনের সব জায়গায় স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরার সুযোগ নেই। বন বিভাগের নির্ধারিত অনুমতি বা বৈধ পাস নিয়ে শুধু নির্দিষ্ট পথ ও পর্যটন স্পটেই প্রবেশ করা যায়, আর কিছু এলাকায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ অনুমতিও।
পর্যটকদের সুন্দরবন ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য মোংলা, খুলনার চালনা ও সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় প্রচুর ট্রলার পাওয়া যায়। একদিনের সংক্ষিপ্ত সফরের জন্য মোংলা থেকে পশুর নদ হয়ে করমজল ও হাড়বাড়িয়া, খুলনা থেকে রূপসা-শিবসা নদী হয়ে কালাবাগী ও শেখেরটেক, এবং মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাকাছিয়া ও দোবেকী এলাকায় ঘুরে আসা যায়।
ট্রাভেল এজেন্সির প্যাকেজ নিলে সাধারণত সব ফি একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে নিজ উদ্যোগে একদিনের জন্য গেলে প্রতিটি স্পটের প্রবেশ ফি আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হয়। মোংলা থেকে খুব সকালে যাত্রা শুরু করলে করমজল ও হাড়বাড়িয়া—দুটি স্থানই একদিনে ঘুরে দেখা সম্ভব। শুধু করমজল ভ্রমণে নৌযান ভাড়া লাগে এক থেকে দুই হাজার টাকা, আর দুটি স্থানেই যেতে চাইলে খরচ পড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই সুবিধাজনক।
খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন কৈলাসগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ইকোকটেজ, যেখানে থেকে অনেকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। মোংলা থেকে সরাসরি, অথবা খুলনা হয়ে মোংলা কিংবা চালনার মধ্য দিয়ে এসব কটেজে পৌঁছানো যায়। বর্তমানে খুলনা থেকে সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য প্রায় পঁয়ষট্টিটি জলযান চলাচল করে, যেগুলোর ধারণক্ষমতা ছয় থেকে পঁচাত্তর জন পর্যন্ত বিভিন্ন রকম।
সাধারণত সুন্দরবন ভ্রমণের প্যাকেজগুলো তিন দিন দুই রাতের হয়ে থাকে। কোনো ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করলে আগেভাগে মোট খরচের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। উৎসব মৌসুম বা দীর্ঘ ছুটিতে বুকিংয়ের চাপ বেশি থাকে, তাই কয়েক মাস আগে থেকেই বুকিং করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
খরচের হিসাবে, নন-এসি জলযানে জনপ্রতি খরচ পড়ে আট থেকে বারো হাজার টাকা, আর এসি জলযানে তা চৌদ্দ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই খরচের মধ্যে অনুমতি ফি, থাকার ব্যবস্থা, গাইড এবং সকাল-দুপুর-রাতের খাবারসহ দুই বেলার নাশতা অন্তর্ভুক্ত থাকে—অর্থাৎ জলযানে ওঠা থেকে শুরু করে সুন্দরবন ঘুরে ফিরে আসা পর্যন্ত পুরো খরচ এর মধ্যেই ধরা থাকে।
সুন্দরবনে ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, এবং কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশেরও অনুমতি নেই। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যকলাপ বা সামগ্রী বহন থেকে বিরত থাকতে হবে—বিশেষভাবে বন বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে, ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেটের মতো পরিবেশ-বিধ্বংসী জিনিসপত্র নিয়ে বনে না যাওয়ার। এ ছাড়া বনের পশুপাখিদের বিরক্ত করে এমন কোনো আচরণ থেকেও পর্যটকদের বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তিন মাসের বিরতি শেষে সুন্দরবন আবার পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি সুখবর। তবে ভ্রমণের আনন্দ নির্বিঘ্ন করতে হলে আগেভাগে পরিকল্পনা, সঠিক বুকিং এবং বন বিভাগের নিয়মকানুন মেনে চলাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

