বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ কৃষিপরিবারের ৫০ লাখ মানুষকে চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এফএওর ‘মনিটরিং ইমার্জেন্সি এগ্রিকালচার সাপোর্ট’-এর ১৪তম পর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নভেম্বরের তুলনায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন কৃষিপরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ বেড়েছে। সর্বশেষ এই পরিস্থিতি মূল্যায়নে দেশের ৬৪ জেলার ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের সঙ্গে এক মাস ধরে টেলিফোনে কথা বলেছে সংস্থাটি।
২৫ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে কৃষি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দুটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট কতসংখ্যক পরিবার সহায়তা চায়, সে হিসাবে চট্টগ্রাম এগিয়ে রয়েছে। এরপর রয়েছে রংপুর, ঢাকা ও রাজশাহী। এসব অঞ্চলে কৃষিপরিবারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মোট সহায়তাপ্রয়োজনীয় পরিবারের সংখ্যাও বেশি। অন্যদিকে কৃষিপরিবারের অনুপাতে সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরে। দুই সূচকেই ওপরের সারিতে রয়েছে শুধু রংপুর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদী অববাহিকা, হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতেই পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়ায় এসব এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সহায়তার প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষক। তাদের ৫৭ শতাংশের চাষের জমির পরিমাণ এক হেক্টরেরও কম। আবার ৬০ শতাংশ পরিবার দেশের সবচেয়ে নিম্ন আয়ের শ্রেণির মধ্যে পড়ে। কৃষিকাজের পাশাপাশি দিনমজুরি, অনিয়মিত অকৃষি শ্রম এবং অল্প পুঁজি নির্ভর ছোটখাটো কাজের ওপর তাদের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় মেটানো কিংবা আকস্মিক ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এফএওর তথ্য বলছে, সহায়তাপ্রয়োজনীয় পরিবারের প্রায় ৮৪ শতাংশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ শতাংশ পরিবার, যা আগের পর্যায়ের তুলনায় ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
আর্থিক চাপের কারণে ৬৭ শতাংশ পরিবার বাকিতে খাবার কিনতে বাধ্য হয়েছে। ৬৬ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়েছে। কৃষি উপকরণ কেনার খরচ কমিয়েছে ৩০ শতাংশ পরিবার।
কৃষকদের জন্য উৎপাদন উপকরণ, ফসলের রোগবালাই এবং বাজারজাতকরণ বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। গত নভেম্বরের তুলনায় ফসলে রোগবালাইয়ের অভিযোগ বেড়েছে ৩০ শতাংশীয় পয়েন্ট। সার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার কথাও জানিয়েছেন আগের তুলনায় আরও ১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি কৃষক।
ফসল বিক্রির সমস্যাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগের পর্যায়ে যেখানে ৯ শতাংশ পরিবার এ সমস্যার কথা জানিয়েছিল, এবার তা বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূলত উৎপাদিত ফসলের কম দাম পাওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহায়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে কৃষি উপকরণের। প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোর ৭২ শতাংশই বীজ, সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নগদ সহায়তার চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে। গত নভেম্বরের তুলনায় এ ধরনের সহায়তার চাহিদা ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্ষার বন্যা, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবারের আয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবেই নগদ সহায়তার চাহিদা বেড়েছে বলে মনে করছে এফএও।
এ ছাড়া ৫১ শতাংশ পরিবার পশুখাদ্য এবং ৩৩ শতাংশ পরিবার পশুর চিকিৎসাসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমন চাষের মৌসুম সামনে রেখে কৃষি উপকরণ, নগদ অর্থ, পশুর চিকিৎসা এবং পানি ব্যবস্থাপনা—এই চার ধরনের সহায়তা সমন্বিতভাবে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবেও বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। গত ৭ থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে দেশের ৪৩ জেলার ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৩৪ হাজার টনের বেশি ফসল নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ছিল চাষাধীন মোট ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর জমির প্রায় ৩ শতাংশ।
এফএওর প্রতিবেদনের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা ও ফসলের জন্য বীজ, চারা ও ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প জমিতে বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষায় আগাম পাকে এমন ধানের জাতও ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ব্রি ধান ১১৮ চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত জাতের তুলনায় এ ধান ১০ থেকে ১৫ দিন আগে কাটা যায়, ফলে আগাম বন্যার আগেই কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
সরকার গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও কাঁচামরিচের উৎপাদন বাড়াতেও প্রণোদনা ও চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি এসব কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দুর্যোগের পর সহায়তা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সিপিডির গবেষণা ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী বলেছেন, এফএওর প্রতিবেদনটি শুধু একটি মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরছে না, বরং বিদ্যমান কৃষি ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের কাছে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
তার মতে, বিশেষ করে যেসব কৃষকের জমির মালিকানা নিশ্চিত নয় কিংবা আর্থিক সঞ্চয় ও নিরাপত্তা নেই, তাদের কাছে কৃষি সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বাড়তে থাকায় কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ব্যবস্থাপনাও জোরদার করা জরুরি।

