দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এবার সবচেয়ে বড় বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ – ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা, যা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (৩০,৭৪১ কোটি), স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (২৬,৮০৬ কোটি) এমনকি শিক্ষার চেয়েও বেশি। এই ধারা নতুন নয়; কয়েক বছর ধরেই উন্নয়ন বাজেটে এই একটি বিভাগ শীর্ষে থাকছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থে যেসব রাস্তা, সেতু, নলকূপ কিংবা বাজার-ঘর তৈরি হয়, তার সিদ্ধান্ত আদৌ কতটা ‘স্থানীয়’? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর প্রায় পুরোটাই – স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডির হাতে থাকা প্রায় তিন লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটার সড়ক নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকা থেকে, এমন এক কাঠামোর মাধ্যমে যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই।
বরিশালের একটি সড়ক যা দেখিয়ে দেয় পুরো ব্যবস্থাকে
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সানুহার-ধামুরা-সাতলা সড়কটি পাঁচটি ইউনিয়ন- সাতলা, হারতা, জল্লা, শোলক ও বামরাইল এর ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করেন। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি এখন খানাখন্দে ভরা, এলাকাবাসীর নিত্যদিনের দুর্ভোগের কারণ।
এই সড়ক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় কে? উজিরপুরে থাকেন একজন উপজেলা প্রকৌশলী, তার ওপরে বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী, তার ওপরে ঢাকার আগারগাঁওয়ে প্রধান প্রকৌশলী। এই তিন ধাপের কোথাও কোনো নির্বাচিত ব্যক্তির ভূমিকা নেই- উপজেলা পরিষদ কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার বাইরে।
কোনো সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে তা প্রথমে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত হতে হয়, যা পরিকল্পনা কমিশন হয়ে একনেকে অনুমোদিত হয় যার পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া। ডিপিপির বাইরে থাকা সড়কের জন্য উপজেলা প্রকৌশলী দরপত্র ডাকতে পারেন না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাসের বেশি কিছু দিতে পারেন না।
সংখ্যায় বৈষম্য: সড়ক ও জনপথের ২২ হাজার বনাম এলজিইডির ৩ লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটার
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর; যাকে সাধারণত দেশের ‘সড়কের মালিক’ বলে ভাবা হয় তাদের হাতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক মিলিয়ে আছে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। অথচ স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন এলজিইডির হাতে আছে এর প্রায় ১৭ গুণ – তিন লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ দেশের প্রায় সব রাস্তাই আসলে সড়ক মন্ত্রণালয়ের নয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের।
এই বিশাল নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ বরাবরই চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এলজিইডি রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ২১ হাজার কোটি টাকা চেয়ে পেয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ২০০ কোটি যা কিনা চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ। প্রথম আলোর হিসাবে, এর আগের তিন বছর মিলিয়ে চাওয়া হয়েছিল ৫৯ হাজার কোটি টাকা, পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গণহারে অপসারণ
২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ আগস্ট – দুই দিনের ব্যবধানে সারাদেশে ৮৭৬ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয় – ৬০ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ৪৯৩ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ৩২৩ জন পৌর মেয়র। তাদের জায়গায় দায়িত্ব পান বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা। দুই বছর পার হলেও এই ব্যবস্থা এখনো বহাল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল, আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নির্বাহী আদেশে অপসারণ করা হবে না। তারপরও ২০২৪ সালের অধ্যাদেশগুলোতে থাকা ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ অপসারণের ধারা নতুন সরকার আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের সময়সূচি ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু কাঠামোগত ক্ষমতা অপরিবর্তিত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি এসেছে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ, এই পাঁচ স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে বাজেটে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে বাকি স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ মাস।
কিন্তু বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো- নির্বাচন হলেই কি সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া স্থানীয় হয়ে যাবে? ২০১১ সালের সংশোধনীর পর থেকে উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে থাকা ক্ষমতার কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষার মতো ১৭টি সরকারি দপ্তর আইনে উপজেলা চেয়ারম্যানের অধীনে থাকার কথা থাকলেও, এসব দপ্তরের কর্মকর্তাদের বেতন, বদলি ও পদোন্নতি এখনও নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকার নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও তার ভবিষ্যৎ
২০২৫ সালের এপ্রিলে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে দেশের ৬৪ জেলার প্রায় ৪৬ হাজার মানুষের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল- আদায়কৃত ভ্যাটের এক-তৃতীয়াংশ স্থানীয় সরকারকে বরাদ্দ দেওয়া, যাতে বর্তমানে জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশেরও কম পাওয়া স্থানীয় সরকারগুলো আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারে।
কমিশন আরও সুপারিশ করেছে, পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আইনের বদলে একটি অভিন্ন আইন প্রণয়ন এবং একযোগে সব স্তরের নির্বাচন আয়োজন, যাতে মাত্র ৪০ দিনের একটি সময়সূচিতে ইউনিয়ন থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়।
তবে ভ্যাটের এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দের প্রস্তাব নিয়ে সরকার এখনো সুস্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি।
তুলনামূলক চিত্র: প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা
বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট সরকারি ব্যয়ের মাত্র ৭ শতাংশ খরচ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো- ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব মিলিয়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার গড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ, শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ২৮ শতাংশ।
নেপাল ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর দুই বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার কাঠামো দাঁড় করিয়েছে এবং এখন কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরাসরি প্রদেশ ও স্থানীয় সরকারের হাতে যায়। ভারতে ১৯৯৩ সালের সাংবিধানিক সংশোধনী পঞ্চায়েতে নিয়মিত নির্বাচন ও রাজস্ব বণ্টনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দিয়েছে। ফিলিপাইনে আইন অনুযায়ী জাতীয় করের ৪০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় সরকারের কাছে যায়, যা ২০১৮ সালের একটি সুপ্রিম কোর্ট রায়ের পর আরও বেড়েছে।
এই দেশগুলোতে সিদ্ধান্তের ভিত্তি আইনি সূত্র, কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প-তালিকা নয়।
অদক্ষতার অভিযোগ নয়, প্রশ্নটা কাঠামোর
এলজিইডির কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ কম, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে সারাদেশে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল সাড়ে ৬৭ শতাংশ, সেখানে স্থানীয় সরকার বিভাগের নিজস্ব বাস্তবায়ন হার ছিল ৮২ শতাংশ – সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রশ্নটা তাই দক্ষতার নয়, বরং জবাবদিহির- যে টাকার নাম ‘স্থানীয়’, সেই টাকার সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া প্রকৃত অর্থে স্থানীয় করার একটি কার্যকর কাঠামো এখনো দাঁড়ায়নি।
তবে বিকেন্দ্রীকরণ যে নিজে থেকেই সমাধান নয়, তারও নজির আছে-
ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৯ সালের বিকেন্দ্রীকরণের পর গবেষকরা দেখেছেন, দুর্নীতি কমেনি, বরং তা কেন্দ্রীভূত কয়েকজনের হাত থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বহু স্থানীয় কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগীর মধ্যে। ফলে প্রশ্নটা শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের নয়, তার সঙ্গে জবাবদিহির কাঠামো গড়ে তোলারও।
সামনে কী
আগামী কয়েক মাসে দেশে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নতুন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমন এক কাঠামোতে দায়িত্ব নেবেন, যেখানে মূল সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা-বাজেট বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন, কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলি এখনও কেন্দ্রীভূত ঢাকায়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া আর সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া স্থানীয় হয়ে ওঠা এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক ঘোচানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

