বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা জোরদার করতে নতুন ভিসা নীতি অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। নতুন নীতিতে বিদেশিদের জন্য ৩৪ ধরনের ভিসা শ্রেণি রাখা হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিতে কারা আবেদন করতে পারবেন, কতদিন ভিসা কার্যকর থাকবে, মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ এবং কী ধরনের শর্ত মানতে হবে—তা স্পষ্ট করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘ভিসা নীতি ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আগের ভিসা কাঠামো বাতিল করে নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন শাখা শিগগির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠাবে।
নতুন নীতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের জন্য আলাদা ভিসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটক, চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তি, মানবিক সহায়তায় যুক্ত ব্যক্তি এবং ধর্মীয় শিক্ষা নিতে আসা বিদেশিদের জন্যও নির্দিষ্ট সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন নীতির আওতায় ব্যবসায়িক ভিসা সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিবার বাংলাদেশে প্রবেশের পর সর্বোচ্চ ৯০ দিন অবস্থান করা যাবে।
প্রয়োজন হলে এ ভিসার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। তবে ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে চাকরি বা অন্য কোনো ধরনের অনুমোদনহীন কাজ করা যাবে না।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চালু করা হয়েছে আলাদা ‘ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী’ শ্রেণির ভিসা। শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা বিদেশিরা এই সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশে কমপক্ষে ১ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ অথবা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিক একাধিক বছরের ভিসা পেতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে ‘ভিসা প্রয়োজন নেই’ সুবিধাও পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মী, বিদেশি কর্মী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের জন্যও পৃথক ভিসা শ্রেণি রাখা হয়েছে।
কোনো প্রকল্পে যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রকল্প চালু করা বা কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণির ভিসা পেতে পারেন। অনুমোদিত কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর মেয়াদ বাড়ানো যাবে।
পর্যটন ও জরুরি ব্যবসায়িক ভ্রমণ সহজ করতে বিমানবন্দর বা নির্ধারিত প্রবেশপথে ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একবার প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ দিনের ভিসা দেওয়া যেতে পারে।
বিনিয়োগকারী, সরকারি অতিথি এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকরা এই সুবিধা পেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে ফেরার টিকিট এবং বাংলাদেশে অবস্থানের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকার প্রমাণসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
চিকিৎসা, মানবিক সহায়তা এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের জন্যও বিশেষ ভিসা সুবিধা রাখা হয়েছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দেওয়া ভিসা প্রথমে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে তা এক বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
নতুন নীতিতে বৈধভাবে বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি অভিবাসন আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পর্যটন, ব্যবসা, পড়াশোনা বা নির্ভরশীল ব্যক্তির ভিসা নিয়ে এসে অনুমতি ছাড়া চাকরি বা অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। এ ধরনের নিয়ম ভঙ্গ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভিসা বাতিল হতে পারে।
সঠিক অনুমোদন ছাড়া বিদেশি নাগরিককে চাকরি দিলে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকেও জরিমানার মুখে পড়তে হবে। প্রথমবার অপরাধের জন্য ১ লাখ টাকা এবং পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রবেশের ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে বিদেশি কর্মীদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ অথবা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মতো সংস্থা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবে।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশে অবস্থান করলে জরিমানার পরিমাণও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
১ থেকে ১৫ দিন অতিরিক্ত অবস্থানের জন্য প্রতিদিন ১ হাজার টাকা, ১৬ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ২ হাজার টাকা এবং ৯০ দিনের বেশি অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
দীর্ঘ সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান করলে ১৯৪৬ সালের বিদেশি নাগরিক আইন অনুযায়ী মামলা ও শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে।
তবে গুরুতর ও প্রমাণিত চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে জরিমানা মওকুফের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
নতুন নীতিতে যন্ত্রে পাঠযোগ্য ভিসার ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ভিসা ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের আশা, নতুন ভিসা নীতির ফলে প্রকৃত বিনিয়োগকারী, দক্ষ পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের বাংলাদেশে আসা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়ম মানা নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।

