জমি অধিগ্রহণের নামে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, তার একটা অংশ থাকে ‘আনুষঙ্গিক’ বা কন্টিনজেন্সি খাতে। এই অর্থ দিয়ে মূলত জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় নানা আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো হয়। কিন্তু অনেক সময় প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও এই অর্থ অব্যয়িত থেকে যায়। এবার সেই সব অব্যবহৃত ও অব্যয়িত অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি ‘ভূমি অধিগ্রহণ আনুষঙ্গিক (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কন্টিনজেন্সি-এলএসি) খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে, যা গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব ভূমি অধিগ্রহণ মামলার নথি কনসাইনমেন্টের মাধ্যমে রেকর্ডরুমে সংরক্ষিত রয়েছে এবং অ্যাওয়ার্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট হিসাবরক্ষণ অফিস কর্তৃক নিরীক্ষিত হওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে, সেসব মামলার বিপরীতে এলএসি খাতে জমাকৃত সব অব্যবহৃত ও অব্যয়িত অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দিতে হবে। নির্দেশিকা জারির তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এই অর্থ প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের সংযুক্ত তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের আনুষঙ্গিক খাতের অর্থ ব্যয়, হিসাব সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এলএসি খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ মামলার কার্যক্রম চূড়ান্ত হওয়ার পর অব্যয়িত অর্থ সংশ্লিষ্ট হিসাবে সর্বোচ্চ তিন বছর সংরক্ষণ করা যাবে। এই সময়ের মধ্যে নির্দেশিকায় নির্ধারিত খাতে অর্থ ব্যয় করা যাবে। কিন্তু জমির দখল হস্তান্তর এবং অ্যাওয়ার্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট হিসাবরক্ষণ বিভাগ কর্তৃক নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত তিন বছর অতিবাহিত হলে অব্যয়িত উদ্বৃত্ত অর্থ ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে সরকারি তহবিলে জমা দিতে হবে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ মামলার বিপরীতে প্রত্যাশী ব্যক্তি বা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থের পাশাপাশি এলএসি খাতের অর্থ পৃথক পার্সোনাল লেজার (পিএল) অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে। এই অর্থ সরকারি কোনো রাজস্ব বা আয় নয়; বরং ভূমি অধিগ্রহণ মামলা ও প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য ব্যবহৃত হবে। পৃথক রেজিস্টার ও ক্যাশ বইয়ে এই খাতের হিসাব সংরক্ষণেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলিত অর্থের ওপর ৩ শতাংশ এবং ১ কোটি টাকার বেশি হলে ২ শতাংশ হারে এলএসি অর্থ আদায় করা হবে। বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যেকোনো অঙ্কের প্রাক্কলিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে এই অর্থ আদায় করা হবে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ভূমি অধিগ্রহণ মামলার বিপরীতে এলএসি খাতে জমাকৃত অর্থ সাধারণত অন্য কোনো মামলার আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে জরুরি প্রয়োজনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিয়ে অন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ মামলার সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে।
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের প্রতিবছর এলএসি খাতের ব্যয়ের হিসাব এবং কেসভিত্তিক অব্যয়িত অর্থের হিসাব বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এই খাতের অর্থ ব্যয় প্রচলিত আর্থিক বিধি-বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) কার্যালয় তা নিরীক্ষা করবে। নতুন নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার পর ভূমি অধিগ্রহণ আনুষঙ্গিক খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত পূর্বে জারি করা সব নির্দেশনা, পরিপত্র ও অফিস আদেশ রহিত হবে।
ভূমি অধিগ্রহণজনিত অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এসব অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগ ছিল। এই নতুন নিয়মে অব্যয়িত অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফিরে আসবে, যা সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধে সহায়ক হবে।

