সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় আবারও পিছিয়ে যাচ্ছে। ভালভের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় কেন্দ্রটির পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। ত্রুটি কবে নাগাদ মেরামত হবে এবং ঠিক কখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না সরকার।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ তথ্য জানান। বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্জন তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী জানান, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে এরই মধ্যে ‘বি’ ধাপের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কিন্তু দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ‘সি’ ধাপের পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না।
সমস্যা সমাধানের সময়সীমা সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। দুটি ভালভ কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণ করতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই ত্রুটির প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
প্রকল্পের নকশাকার প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভালভ দুটি পুরোপুরি পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান মন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প বিবেচনায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভালভ এনে প্রথম ইউনিটে স্থাপন করা অথবা রাশিয়ার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নতুন ভালভ তৈরি করে দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ করা। যে বিকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই বেছে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নতুন ভালভ আনতে বাড়তে পারে সময়
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রের সেফটি ভালভ নিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ভালভগুলো প্রয়োজনীয় মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থাও খোঁজা হচ্ছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অত্যাধুনিক সেফটি ভালভ মূলত ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি হয়। শুরুতে ইউক্রেনের একটি প্রতিষ্ঠানে ভালভ তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। পরে তুরস্ক থেকে ভালভ সংগ্রহ করা হয়।
তবে নতুন করে ভালভ তৈরি করে আনতে হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ, এ ধরনের বিশেষায়িত যন্ত্র তৈরি ও সরবরাহ করতে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
সেফটি ভালভ পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শীতলীকরণ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক মাত্রায় চাপ তৈরি হলে ভালভ খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেয়। এর ফলে অতিরিক্ত চাপের কারণে যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভালভের ত্রুটি ঠিক হওয়ার পরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ দিতে হলে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সেফটি ভালভ কার্যকর হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হবে। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করতে অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পরও কয়েক মাস ধরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরমাণু শক্তি কমিশনের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় চলতি বছরেই প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে বর্তমানে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যমান বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে তরল জ্বালানি ও গ্যাসের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয়ও কমবে।
মূল সময়সূচি অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটির কাজের সময়সূচি কয়েক দফা পিছিয়েছে।
চলতি বছর প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য থাকলেও সেফটি ভালভের ত্রুটিতে সেই সময়সূচিও এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

