বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য ধোয়ার একটি ছবি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ নদীটি এখনো ভয়াবহ দূষণের শিকার। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই ছবিতে দেখা যায়, কয়েকজন কারখানার শ্রমিক নদীর পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করছেন। এতে শুধু নদীর পানি দূষিত হচ্ছে না, বরং বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক পানিতে মিশে পরিবেশের জন্য আরও বড় হুমকি তৈরি করছে।
দীর্ঘদিন ধরে বুড়িগঙ্গা দূষণ রোধে নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। নদীর তীরজুড়ে থাকা শত শত ছোট প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা এখনো নিয়মিতভাবে বর্জ্য নদীতে ফেলছে। শুধু কামরাঙ্গীরচর এলাকাতেই নয়, নদীর পাশের ইসলামবাগ এলাকায় রয়েছে ৩০০-এর বেশি প্লাস্টিক কারখানা। এর মধ্যে অনেক কারখানার প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা সরকারি নথিপত্র নেই।
তবে শুধু অবৈধ কারখানাই নয়, বৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও অনেকেই পরিবেশগত নিয়ম মানছে না। সরকারি অনুমোদন থাকলেও যদি নদীর পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য ধোয়া হয়, তাহলে দূষণ বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গার জলজ প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে নদীর পানি ব্যবহারকারী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। পানিতে থাকা বিষাক্ত পদার্থ মানুষের জীবন ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের নতুন উদ্যোগ থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের একটি পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত কারখানাকে তালিকাভুক্ত ও ধাপে ধাপে নিবন্ধনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। তবে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility) নির্দেশনায় রপ্তানিমুখী কিছু প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ছাড়, পরিবেশ অধিদপ্তরের সীমিত জনবল এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ অনেক কারখানাকে নিয়ম ভাঙার সুযোগ করে দিতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় এর আগে বুড়িগঙ্গার পাশে ৫০০-এর বেশি দূষণ উৎস শনাক্ত করা হয়েছিল, যেখান থেকে নিয়মিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে।
দূষণের ভয়াবহতার কারণে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে প্রতি লিটারে মাত্র ০.১ মিলিগ্রামে, যা নদীকে জলজ প্রাণীর বসবাসের জন্য প্রায় অযোগ্য করে তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট গত ২ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বুড়িগঙ্গার তীর থেকে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছেন। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো, এই নির্দেশ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং আগের মতো কোনো আদালতের আদেশ যেন অবহেলিত না হয়।
বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। নদীকে বাঁচাতে হলে অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কঠোর পরিবেশগত নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে।
বুড়িগঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি ঢাকার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। তাই এই নদীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

