দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার দুই বছরের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে, তা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা ঘোষণার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি কূপ খননের অনুমোদন দিতে পেরেছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি ৯৭টি কূপ খনন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কারণ এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক কূপ খননের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত রিগ, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভায় তিনটি কূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৫, বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনামগঞ্জের সুনেত্র-২ কূপ খনন করা হবে। গত ২২ জুলাই প্রায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে ছয় মাসে মাত্র তিনটি কূপ খননের অনুমোদন পাওয়ায় সরকারের ১০০ কূপ খননের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের কম সময়ে আরও ৯৭টি কূপ খনন করা বাস্তবসম্মতভাবে কঠিন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগও নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, আগের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে মোট ১২০টি কূপ খননের চিন্তা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আগের ২০টি কূপ এবং নতুন করে ১০০টি কূপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সাতটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় ৫৯টি প্রকল্প অনুমোদন পেলেও স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অনুমোদন পেয়েছে মাত্র একটি প্রকল্প।
এর আগে ২০২২ সালে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা। তবে সময়মতো সব কূপ খনন করা যায়নি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ওই ৫০টি কূপের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০টি খনন করা হয়েছে। বাকি ২০টি কূপও নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বড় পরিসরে কূপ খননের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পর্যাপ্ত রিগের অভাব। বাপেক্সের নিজস্ব রিগ সীমিত হওয়ায় বিদেশি রিগ ভাড়া করা বা আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে যুক্ত করার প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া অর্থায়ন, বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও কূপ খননের গতি কমিয়েছে।
পেট্রোবাংলার নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে ১২০টি কূপ খনন করা হলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০টি করে কূপ খননের প্রয়োজন হবে। এজন্য দেশীয় সক্ষমতার পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তি ও বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আগের পরিকল্পনায় ১০০টি কূপের মধ্যে ৬৯টি ছিল অনুসন্ধান কূপ এবং ৩১টি ছিল পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার বা সংস্কার কাজ। এর মধ্যে বাপেক্সের ৬৮টি কূপ খননের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। বাকি কাজ করার কথা ছিল বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল)।
এই প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৩ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৫ হাজার ৭২২ কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
তবে বর্তমানে প্রকল্পের অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং কূপ খননের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে।
দেশে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কয়েক বছর ধরে কমছে। চাহিদা পূরণে সরকারকে বাড়তি নির্ভর করতে হচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা সফল করতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

