দেশের অন্যতম প্রধান ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ)-এর রোগী তথ্য বলছে, ক্যান্সার চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ২০২৫ সালের ক্যান্সার নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাক্ষরজ্ঞানহীন অথবা স্বল্পশিক্ষিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সারের সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও রোগ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রাথমিক লক্ষণ চেনা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন, ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
এনআইসিআরএইচের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন ৪২ হাজার ৪৯৪ জন রোগী। তাদের মধ্যে ৩১ হাজার ৪৬ জনের ক্যান্সার শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৮৩১ জন রোগীকে ২০২৫ সালের ক্যান্সার নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব রোগীর মধ্যে ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ হাজার ৯১৪ জন ছিলেন স্বাক্ষরজ্ঞানহীন। এছাড়া ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৯২ জন রোগী কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা পেয়েছেন। অর্থাৎ স্বাক্ষরজ্ঞানহীন ও স্বল্পশিক্ষিত রোগীর মোট হার দাঁড়িয়েছে ৮০ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু একটি হাসপাতালের তথ্য দিয়ে দেশের সব ক্যান্সার রোগীর চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। জাতীয় পর্যায়ে প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. চৌধুরী সামসুল হক কিবরীয়া বলেন, শিক্ষার সঙ্গে ক্যান্সারের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তার মতে, অনেক স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর রোগী রোগের প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে পারেন না, চিকিৎসা নিতে দেরি করেন কিংবা বিকল্প চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। এতে রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় ক্যান্সার অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা কমে যায়।
এনআইসিআরএইচের নিবন্ধন অনুযায়ী, গত বছর চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে নারী ছিলেন ১৫ হাজার ৮০৯ জন এবং পুরুষ ১৫ হাজার ২২ জন। রোগীদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৫০ বছর। সবচেয়ে কম বয়সী রোগীর বয়স ছিল এক বছর এবং সবচেয়ে বেশি বয়সী রোগীর বয়স ছিল ১০৯ বছর।
অঙ্গভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে পরিপাকতন্ত্রে। এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৩৮৮, যা মোট রোগীর ২০ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এরপর শ্বসনতন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন ৫ হাজার ৫৪৬ জন বা ১৮ শতাংশ রোগী। নারীর প্রজনন অঙ্গের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন ৪ হাজার ৭৩৪ জন। এছাড়া স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০০।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ এবং নারী রোগী প্রায় ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন।
একই সময়ে ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯০৬ জন। দেশে পাঁচ বছর মেয়াদে ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে থাকা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮১৮ জন।
নতুন রোগীর হিসাবে খাদ্যনালির ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ২৯ হাজার ৪১০ জন। এরপর ফুসফুসের ক্যান্সার, পাকস্থলীর ক্যান্সার, ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের অবস্থান।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রোগ দেরিতে শনাক্ত হওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে অনেক ধরনের ক্যান্সার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, দেশের ক্যান্সার পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি চালু করা জরুরি। বর্তমানে একটি হাসপাতালের তথ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রবণতা নির্ধারণ করা কঠিন।
বিভিন্ন গবেষণাতেও ক্যান্সার রোগীদের শিক্ষাগত অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের ৪০৩ জন ক্যান্সার রোগীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ রোগী ছিলেন নিরক্ষর এবং ২০ দশমিক ৩ শতাংশের শিক্ষা ছিল প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত।
আরেকটি হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ১৫ শতাংশ ছিলেন নিরক্ষর এবং ৪৮ শতাংশের শিক্ষা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যে।
তবে সব গবেষণায় একই চিত্র পাওয়া যায়নি। কিছু গবেষণায় তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত রোগীর উপস্থিতিও দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর শিক্ষাগত অবস্থার পাশাপাশি আর্থসামাজিক অবস্থা, চিকিৎসা সুবিধার প্রাপ্যতা, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ করা।
তারা মনে করেন, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের আদলে দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে রোগীদের ভোগান্তি কমবে এবং সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

