গত ১৪ আগস্ট ২০২৬, সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা আবারও বাংলাদেশের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাবেক এলএনজি ক্যারিয়ার এমটি রাসি জাহাজ কাটার সময় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে নয়জন শ্রমিক প্রাণ হারান। শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং শিল্পখাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি বড় সতর্কবার্তা। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাহাজটি ভাঙার আগে কয়েক ধাপে পরিদর্শন ও অনুমোদনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তবে জাহাজের কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে বন্ধ জায়গা বা বিশেষায়িত ট্যাংকগুলোতে সরাসরি প্রবেশ করে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে কিছু বিপজ্জনক গ্যাস বা রাসায়নিকের উপস্থিতি শুরুতেই শনাক্ত করা যায়নি।
এখানেই মূল প্রশ্ন আসে—শ্রমিকরা যখন সেই জায়গায় প্রবেশ করেছিলেন, তখন কি সত্যিই বাতাস নিরাপদ ছিল? আর কাজ চলাকালীন সেই পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি?
একটি নিরাপত্তা সনদ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের পরিস্থিতির নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু তা ভবিষ্যতের প্রতিটি মুহূর্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বিশেষ করে জাহাজের মতো পুরোনো কাঠামোর ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস হঠাৎ জমে যেতে পারে। হাইড্রোজেন সালফাইড বাতাসের তুলনায় ভারী হওয়ায় নিচু বা কম বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় জমা হতে পারে। একই সঙ্গে অক্সিজেনের ঘাটতি, কার্বন মনোক্সাইড কিংবা দাহ্য গ্যাসের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
যেসব জায়গায় এমন অদৃশ্য ঝুঁকি থাকে, সেখানে শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য ব্যক্তিগত গ্যাস শনাক্তকারী যন্ত্র থাকা উচিত, যেমনটি হেলমেট বা সেফটি জুতাকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম হিসেবে ধরা হয়। ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই যন্ত্র অক্সিজেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও দাহ্য গ্যাস শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়া প্রয়োজন।
তবে শুধু গ্যাস ডিটেক্টর থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কাজ শুরুর আগে বাতাস পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, অনুমতিপত্রভিত্তিক কাজের পদ্ধতি , জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষক এবং উদ্ধার প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
একটি সহজ নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে—“ডিটেক্টর ছাড়া প্রবেশ নয়”। গ্যাস অ্যালার্ম বাজলে কাজ বন্ধ করতে হবে এবং সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে।
নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মহড়া। শিল্প প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিষাক্ত গ্যাসের সতর্ক সংকেত, জরুরি সরিয়ে নেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উপস্থিতি গণনা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত বাস্তবভিত্তিক মহড়া করা প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পখাতে অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা কোনো কাগজে লেখা নিয়ম নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চার বিষয়। উন্নত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীরা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন, নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিয়মিত জরুরি মহড়ায় অংশ নেন। কারণ জরুরি মুহূর্তে নতুন করে নিয়ম শেখার সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার ইতিহাসও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাহাজ ভাঙা দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, এরপর আগস্টের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন আরও নয়জন।
তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অগ্রগতিও রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুন জাহাজ পুনর্ব্যবহার সংক্রান্ত হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন কার্যকর হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশও অংশগ্রহণকারী দেশ। এই কনভেনশনে শ্রমিক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, জরুরি প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এসব নিয়ম বাস্তবে প্রতিটি কারখানা ও প্রতিটি শ্রমিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তবে এই সমস্যা শুধু জাহাজ ভাঙা শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে তাজরীন ফ্যাশন অগ্নিকাণ্ডও একটি ভয়াবহ অধ্যায়। ২০১৩ সালে তাজরীন দুর্ঘটনার পর থেকেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া, লিখিত নিরাপত্তা নীতি, আকস্মিক পরিদর্শন এবং জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই শিক্ষা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি জাতীয় শিল্প নিরাপত্তা কাঠামো, যা সব খাতের জন্য একটি মৌলিক মানদণ্ড তৈরি করবে। একে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি স্ট্যান্ডার্ড বা একটি “মাদার সেফটি স্ট্যান্ডার্ড” হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই জাতীয় মানদণ্ডে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, জরুরি ব্যবস্থা, কাজের অনুমতি পদ্ধতি, দুর্ঘটনা ও নিকটবর্তী দুর্ঘটনা রিপোর্টিং, নিয়মিত পরিদর্শন এবং সংশোধনী ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
প্রতিটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে একটি দৈনিক নিরাপত্তা তথ্য বোর্ড থাকা উচিত। সেখানে দুর্ঘটনা, নিকটবর্তী দুর্ঘটনা, প্রশিক্ষণের অবস্থা, সর্বশেষ জরুরি মহড়ার তথ্য, চলমান নিরাপত্তা অনুমতি এবং সংশোধনের অপেক্ষায় থাকা সমস্যাগুলো প্রকাশ করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য শুধু ভালো দেখানো নয়, বরং একটি স্বচ্ছ নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিকের “কাজ বন্ধ করার অধিকার”। যদি কোনো শ্রমিক গ্যাসের ঝুঁকি, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সমস্যা বা অন্য কোনো বড় বিপদ দেখতে পান, তাহলে তার কাজ বন্ধ করার অধিকার থাকতে হবে। নিরাপত্তার শেষ প্রাচীর হিসেবে কোনো শ্রমিকের জীবনকে ব্যবহার করা যাবে না।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ পুনর্ব্যবহারকারী দেশ এবং একই সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু প্রতিযোগিতার মাপকাঠি শুধু কম খরচ, দ্রুত উৎপাদন বা বেশি রপ্তানি হতে পারে না। নিরাপত্তা হতে হবে সবকিছুর ভিত্তি।
একটি সফল শিল্পের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু কত টন জাহাজ পুনর্ব্যবহার হয়েছে, কত পণ্য রপ্তানি হয়েছে বা কত আয় হয়েছে—তা দিয়ে করা যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দিনের শেষে কতজন শ্রমিক নিরাপদে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে গেলেন।
এমটি রাসির সেই নয়জন শ্রমিক আর ফিরে আসবেন না। তাদের স্মৃতি আমাদের জন্য শুধু আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এ ধরনের শোকের মুখোমুখি হতে না হয়। কারণ প্রতিটি জীবনই গুরুত্বপূর্ণ।

