সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতাধীন সেতুগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ১১৬ কোটি টাকার একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নিয়েছে সরকার। এর আওতায় সেতুর কাঠামোগত অবস্থা পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ব্রিজ হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট ফর স্মার্ট মেইনটেন্যান্স টেকনোলজি অব ব্রিজেস আন্ডার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ১০৮ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে দেবে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (KOICA)।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক ব্রিজ হেলথ মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে সেতুর কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত, কার্যকর ও তুলনামূলক কম ব্যয়ে সেতু ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে, সেই সক্ষমতাও তৈরি করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় তিনটি সেতুর বিস্তারিত কাঠামোগত পরিদর্শন করা হবে। এসব পরিদর্শনের ভিত্তিতে সেতুগুলোর মেরামত ও পুনর্বাসনের নকশা তৈরি করা হবে। নির্বাচিত সেতু তিনটি হলো দৌলতদিয়া-ফরিদপুর (গোয়ালচামট)-মাগুরা-ঝিনাইদহ-যশোর-খুলনা-মোংলা জাতীয় মহাসড়ক (এন-৭)-এর কামারখালী সেতু, তারাবো-ডেমরা সড়কের ডেমরা সেতু এবং ঢাকা (মিরপুর)-উথুলী-পাটুরিয়া-নাটাখোলা-কাসিনাথপুর-বগুড়া-রংপুর-বেলডাঙ্গা-বাংলাবান্ধা জাতীয় মহাসড়ক (এন-৫)-এর তোরাসেতু।
এই তিনটি সেতুতেই পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও পুনর্বাসন কাজ করা হবে। পাশাপাশি মধুমতী সেতু, কালনা সেতু ও ডেমরা সেতুতে পরীক্ষামূলকভাবে স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম বা কাঠামোগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় সওজের অধীনে একটি ইন্টিগ্রেটেড ব্রিজ মেইনটেন্যান্স সেন্টারও প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মাধ্যমে সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবের প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি সেতুকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনটি সেতুকে মেরামত, পর্যবেক্ষণ ও নকশা সহায়তার আওতায় আনা হয় এবং তিনটি সেতুতে স্মার্ট স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। কিছু সেতু উভয় ধরনের কার্যক্রমের আওতায় থাকবে।
স্মার্ট মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেতুর কাঠামোগত ত্রুটি বা দুর্বলতা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে। ফলে সেতুর ব্যবহারকাল বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে। তখন পুরো অর্থই KOICA-এর অনুদান থেকে দেওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (SPEC) সভায় দেওয়া সুপারিশের পর প্রকল্পটির কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়। এতে মোট ব্যয় বেড়ে ১১৬ কোটি টাকা হয়। নতুন প্রস্তাবে সরকারের ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং KOICA-এর ১০৮ কোটি টাকা অনুদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নকাল সংশোধন করে জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৩ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সভায় অনুষ্ঠিত SPEC বৈঠকে সংশোধিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকের কাছে সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় সমন্বিত ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠার সরকারি লক্ষ্যও এগিয়ে যাবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও দক্ষতা বাড়াতে সমন্বিত ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রকল্পটির সামঞ্জস্য রয়েছে।
এদিকে KOICA-এর কাছ থেকে পাওয়া বিদেশি সহায়তার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ইতোমধ্যে সম্মতি দিয়েছে।

