ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীপ্রতি চার বেলা খাবারের জন্য কার্যকর বরাদ্দ মাত্র ১৪৯ টাকা। এ বরাদ্দে দেওয়া খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে দুপুর ও রাতের খাবার নিয়ে অভিযোগ বেশি। অনেকের দাবি, খাবার খাওয়ার উপযোগী না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান বাজারদরের তুলনায় খাবারের জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টিবিদ না থাকায় খাবারের মান ও পুষ্টিমান ঠিকভাবে তদারকি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের খাবার হাতে পাওয়ার পর অনেক রোগী ও স্বজন অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, খাবারে বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান দুটিই কম। বিশেষ করে তরকারির মান নিয়ে আপত্তি বেশি।
১৮ দিন ধরে হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে অবস্থান করছেন আবিদ আহমেদ। তার রোগী অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। হাসপাতালের খাবার সম্পর্কে তিনি বলেন, তরকারির মান খুবই খারাপ এবং তা খাওয়ার উপযোগী নয়। বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে শুধু ভাত খান, আর তরকারি বাইরে থেকে কিনে আনেন। তবে সকালের নাশতার মান নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
আরেক রোগীর স্বজন হানিফ মাহমুদের অভিযোগ, দুপুর ও রাতের খাবারের মান খুবই নিম্ন। তার ভাষায়, ভাতের গায়ে পানি লেগে থাকে এবং তরকারিতে হলুদ ও লবণ ছাড়া তেমন কিছু থাকে না। খাবার সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রোগীদের জন্য চার বেলা খাবারের মোট বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে সকালের নাশতার জন্য ৫৩ দশমিক ৬৭ টাকা, দুপুরের খাবারে ৫২ দশমিক ৭৯ টাকা, বিকালের নাশতায় ৩০ দশমিক ৮৭ টাকা এবং রাতের খাবারে ৩৭ দশমিক ৬৭ টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
তবে এই ১৭৫ টাকার মধ্যেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত। ফলে ভ্যাট বাদ দেওয়ার পর রোগীর খাবারের জন্য কার্যকর বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৪৯ টাকায়।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ১৭৫ টাকা থেকে ভ্যাট বাদ দিলে থাকে ১৪৯ টাকা। এর সঙ্গে ঠিকাদার ১০ শতাংশ লাভ করলে রোগীর খাবারের জন্য বাস্তবে ব্যয় করার মতো অর্থ নেমে আসে প্রায় ১৩৫ টাকায়। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এ অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারীর সময় রোগীদের খাবারের বরাদ্দ ১২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়েছিল। সে সময় রোগীদের খাবারে আমিষের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি ছিল।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তখন রোগীদের খাবারে ৫৩ থেকে ৬৫ গ্রাম পর্যন্ত আমিষ সরবরাহ করা হতো। সময়ের সঙ্গে সেই পরিমাণ কমে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ গ্রামে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীদের খাবারে পুষ্টির ঘাটতি তাদের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, একজন রোগীর জন্য ওষুধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পুষ্টিকর খাবারও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওষুধ দিয়ে একজন রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব নয়।
তার মতে, রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী আলাদা ডায়েট প্রয়োজন। সব রোগীর জন্য একই ধরনের খাবার যথেষ্ট নয়। চিকিৎসাধীন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় ক্যালরি, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান খাবারের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের খাবারের মান ও পুষ্টিমান পরীক্ষা করার পাশাপাশি খাবারের তালিকা তৈরিতে নিউট্রিশনিস্টদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। নির্ধারিত পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে রোগীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবেন এবং সুস্থ হতে তাদের বেশি সময় লাগতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যাপ্ত পুষ্টিবিদ না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, আগে ঢামেকে একজন পুষ্টিবিদ ছিলেন। পরে তাকে অন্য হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে এবং এ নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে।
এত বড় একটি হাসপাতালে মাত্র একজন পুষ্টিবিদ কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পুষ্টিবিদের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদার বলেন, রোগীদের জন্য খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালগুলোকে এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। খাবারের মান নির্ধারিত গাইডলাইনের নিচে থাকলে তা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে উন্নীত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীদের খাবারের মান নিশ্চিত করতে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। খাবারের কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে রান্না, পরিবেশন, পুষ্টিমান এবং রোগীর শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়েট—প্রতিটি ধাপেই নিয়মিত তদারকি দরকার।
খাবারে নির্ধারিত পরিমাণ আমিষ, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকছে কিনা, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য একই ধরনের সাধারণ খাবারের পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়েটের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগী ও স্বজনদের খাবার নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মূল্যবৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক কিছু কারণে খাবারের মান নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকতে পারে। তবে ঠিকাদারের কাছ থেকে ভালো মানের খাবার নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবসময় আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে।

