ইলেকট্রনিক পেমেন্ট বা বৈদ্যুতিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এমন একটি অনলাইনভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পণ্য কেনাবেচার অর্থ পরিশোধ ও গ্রহণ করা যায়। এ ব্যবস্থায় ব্যাংক ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করবে। পণ্যের নির্ধারিত মান ও মূল্য নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার সমঝোতার পর বিক্রেতা আনুষ্ঠানিক চালান দেবেন এবং ক্রেতা তাতে সম্মতি জানাবেন। এরপর সেই চালান ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ব্যাংক পুরো লেনদেন সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে।
বর্তমানে ক্রেতা ও বিক্রেতারা প্রচলিত আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইন বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও ক্রেতা খুঁজে নেন। তবে ভবিষ্যতে ব্যাংক এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে, যেখানে যাচাই করা ও বিশ্বস্ত সরবরাহকারী এবং ক্রেতারা নিবন্ধিত থাকবেন। এতে উভয় পক্ষই নিরাপদভাবে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত অংশীদার খুঁজে নিতে পারবেন।
প্রাথমিকভাবে প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে ব্যাংক কমিশন আয় করতে পারে। পরবর্তী সময়ে ক্রেতার কেনাকাটার ধরন, লেনদেনের পরিমাণ ও ঘনত্ব এবং আর্থিক প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে ব্যাংক প্রচলিত ও ইসলামী উভয় পদ্ধতিতে অর্থায়ন সুবিধা দিতে পারে। এমনকি ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর বাকিতে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও ইলেকট্রনিক পেমেন্ট কার্যকর হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্ধারিত মাশুল শুরুতেই পরিশোধ করতে হবে।
দূরবর্তী পাইকারদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন এমন ১০ জন গ্রামীণ ব্যবসায়ী ও সরবরাহব্যবস্থা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে দেখা গেছে, অনেক খুচরা ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয়কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা পাইকারদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন। কখনো কখনো তারা আগাম অর্থ পরিশোধ করলেও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পান না। বরং নিম্নমানের পণ্য পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকার কিছু পাইকার জানিয়েছেন, তারা যদি পণ্য আগে সরবরাহ করেন বা বাকিতে দেন, তাহলে নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে তারা নিজেরাই ঋণ বা বকেয়ার চক্রে আটকে পড়তে পারেন।
অর্থাৎ, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষের মধ্যেই পারস্পরিক আস্থার একটি ঘাটতি রয়েছে। এমনকি লেনদেনটি প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায়—খুচরা ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব থেকে পাইকারের হিসাবে—হলেও সেই আস্থার সংকট পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।
অনলাইন ও ডিজিটাল বাণিজ্য খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের সমস্যার উদাহরণ দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহক পণ্যের মূল্য আগাম পরিশোধ করার পরও বিক্রেতা দুই থেকে চার মাস পরে পণ্য সরবরাহ করেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে। ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২১-এর ভিত্তিতে জারি করা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে পণ্য বা সেবার মূল্য বাবদ আগাম অর্থ সরাসরি জমা করা যাবে না।
এখানেও মূল সমস্যা ছিল বিক্রেতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্রেতার আস্থার ঘাটতি। ফলে ব্যাংক ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে হিসাবধারী হওয়া-না-হওয়া নির্বিশেষে গ্রাহক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এখানে ব্যাংক একটি নিরাপদ ও বিশ্বস্ত অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
ব্যাংক নিশ্চিত করবে যে বিক্রেতা নির্ধারিত পণ্য সরবরাহ করলে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে ব্যাংক কমিশন আয় করবে। একই সঙ্গে এসব লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যাংক একজন খুচরা ব্যবসায়ী, পাইকার কিংবা ব্যক্তিগত গ্রাহকের কেনাবেচার ধরন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
দীর্ঘ সময়ের লেনদেনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ব্যাংক ভবিষ্যতে গ্রাহকের জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়নসীমাও নির্ধারণ করতে পারবে। অর্থাৎ ইলেকট্রনিক পেমেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকের দুটি নতুন ধরনের সেবা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য লেনদেন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী লেনদেন ও কার্যক্রমের ভিত্তিতে গ্রাহককে অর্থায়নের সীমা দেওয়া।
প্রস্তাবিত সেবার মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণ এবং পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।
প্রতিটি ১ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের বিপরীতে ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত মাশুল নির্ধারণ করা যেতে পারে। বর্তমানে কিছু পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহের সময় ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর নগদে মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থায় বিল সংগ্রহের দায়িত্ব নেয় এবং ১,০০০ টাকার লেনদেনে প্রায় ১৮ থেকে ২০ টাকা মাশুল নেয়। মোবাইল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রেও ১,০০০ টাকার লেনদেনে প্রায় ২০ টাকা মাশুল নেওয়া হয়।
ইলেকট্রনিক পেমেন্টের পরিধি হতে পারে সারা বাংলাদেশ। এর লক্ষ্য হবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে অনলাইন বাণিজ্য, ব্যক্তি থেকে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর—সব ধরনের কেনাবেচায় গ্রাহক নিরাপদ লেনদেনের জন্য এ সেবা ব্যবহার করতে আগ্রহী হন।
গ্রাহক সংগ্রহ ও সেবা প্রচারে ব্যাংকের শাখা ও চ্যানেলভিত্তিক ব্যাংকিং বিভাগ যৌথভাবে কাজ করতে পারে। এতে ব্যাংকের সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের ঠিকানা, কেনাকাটার ধরন, ব্যবসার প্রকৃতি এবং লেনদেনের আচরণসহ বিপুল তথ্যভান্ডার তৈরি হবে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে গ্রাহকের জন্য অর্থায়নসীমা নির্ধারণেও কাজে লাগানো যাবে।
পরবর্তী সময়ে ব্যাংক চাইলে দেশ-বিদেশে ক্রেতা ও বিক্রেতা খোঁজার জন্য আলাদা ওয়েবসাইটও তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যাংক একদিকে অর্থায়ন, অন্যদিকে অর্থায়ন ছাড়া বিভিন্ন সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
ইলেকট্রনিক পেমেন্টের প্রচার ব্যাংকের বিদ্যমান শাখা ও বিতরণ নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মুদ্রিত সংবাদমাধ্যম ও বৈদ্যুতিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে করা যেতে পারে।
ইলেকট্রনিক পেমেন্ট চালুর ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হতে পারে—ক্রেতা কীভাবে পণ্যের অর্ডার করবেন। প্রাথমিকভাবে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও অনলাইন বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমেই অর্ডার করা যাবে। ভবিষ্যতে ব্যাংক নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করলে সেখানে নিবন্ধিত বিক্রেতাদের খুঁজে নিয়ে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা স্থাপনে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার মতো ভাড়াভিত্তিক সুবিধা ব্যবহার করে এ খরচ কমানো সম্ভব।
নিরাপদ ও ব্যবহারবান্ধব ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরিতেও বিনিয়োগ দরকার হবে। তবে এ খাতে প্রথম দিকের উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাজারে অগ্রণী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ব্যবহারবান্ধব ও নিরাপদ সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব।
গ্রাহকের নতুন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত না হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে বর্তমানে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার সঙ্গে মানুষ অনেক বেশি পরিচিত। ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও ইলেকট্রনিক পেমেন্টের প্রসারে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকের প্রায় ৫৫ লাখ তালিকাভুক্ত গ্রাহক এবং তাদের ব্যবসায়িক সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের বিবেচনায় সম্ভাব্য গ্রাহকের সংখ্যা আরও বড় হতে পারে।
ব্যাংকের সহকারী সম্পর্ক কর্মকর্তা, সম্পর্ক কর্মকর্তা, জ্যেষ্ঠ সম্পর্ক কর্মকর্তা ও গ্রাহক সম্পর্ক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গ্রাহকদের নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবহারকারীদের অর্থায়নের সুযোগও এ সেবার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো বিক্রেতা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করলে ব্যাংকের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তারা ক্রেতা ও বিক্রেতার বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে এবং নির্ধারিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। পণ্য নির্ধারিত মান অনুযায়ী সরবরাহ না হলে ক্রেতার অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগও রাখা যেতে পারে। এতে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা আরও বাড়বে।
ইলেকট্রনিক পেমেন্ট চালুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার আস্থার ঘাটতি কমানো। পণ্যের নির্ধারিত মান থেকে বিচ্যুতি বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের প্রবণতা কমলে এ ধরনের নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থার চাহিদা বাড়বে।
একইভাবে, বিক্রেতার পণ্য সরবরাহের পর অর্থ না পাওয়ার কারণে সম্ভাব্য ঋণফাঁদের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। প্রযুক্তি ও অনলাইন বাণিজ্যের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর বাজারের প্রকৃত আকার নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হলেও এর পরিধি বড় এবং ক্রমবর্ধমান। ব্যবসার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংক একটি স্বীকৃত ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকের অংশগ্রহণ এ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইলেকট্রনিক পেমেন্টের মাধ্যমে তৈরি হওয়া লেনদেনের বড় তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও আচরণ বিশ্লেষণে ব্যবহার করা যাবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও অর্থায়নসীমা নির্ধারণ ও অনুমোদন করা সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট শুধু একটি ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা নয়; এটি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার আস্থার ঘাটতি কমানোর একটি সম্ভাব্য ব্যাংকিং সমাধান। নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা হিসেবে এটি লেনদেনে জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

