দেশের বাজারে রান্নার গ্যাসের সংকট চলার মধ্যেই স্বল্প আয়ের গ্রামীণ পরিবারগুলোর জন্য ভর্তুকি মূল্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতামত ও দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ পরিবারগুলোর কাছে ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ার পর সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছে মতামত চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে চিঠি দিয়ে গ্রামীণ এলাকায় রান্নার জ্বালানি সরবরাহ এবং জ্বালানি ব্যবহারে নিরাপত্তা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কর্মসূচিটি টিসিবির ডিলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গ্রামের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো রান্নার কাজে কাঠ, খড় ও কেরোসিনের ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানি ব্যবহারে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে পরিবারের রান্নার দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপর থাকায় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। কম দামে এলপিজি সরবরাহ করা গেলে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানিতে তাদের প্রবেশাধিকার বাড়তে পারে।
তবে কর্মসূচিতে ‘অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা’ পরিবার কীভাবে চিহ্নিত করা হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সুবিধাভোগী নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতে টিসিবির বিভিন্ন পণ্য বিতরণ কর্মসূচিতেও এ ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।
এ ছাড়া টিসিবির ডিলাররা সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণে অভ্যস্ত। কিন্তু এলপিজি সিলিন্ডার তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য হওয়ায় এগুলো সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টিসিবির ডিলারদের এলপিজি সিলিন্ডার নিরাপদে ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ আছে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
কর্মসূচিটিকে জরুরি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের কারণে বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলপিজির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। নিম্নমানের সিলিন্ডার বা ভুলভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভর্তুকি দিয়ে এলপিজির সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ দেশের বাজারে বর্তমানে রান্নার এই জ্বালানির সরবরাহেই ঘাটতি রয়েছে।
তাদের মতে, সংকটের মধ্যে একাধিক সংস্থার মতামত নেওয়া ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হলে কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও দেরি হতে পারে। এতে মূল সরবরাহ সংকটও অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতের এলপিজি সিলিন্ডার অনেক সময় সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসে এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক গ্রাহককে এর চেয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ায় সরকারি দর ও বাজারদরের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
গত সাত বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১৫ লাখ টনের ওপরে উঠেছে। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহার করেন আবাসিক গ্রাহকেরা।
বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন। এর প্রায় ৯৮ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারি উদ্যোগের আওতায় আসে মাত্র প্রায় ২ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি পৌঁছে দিতে লক্ষ্যভিত্তিক এলপিজি ভর্তুকি কর্মসূচি চালু করেছে।
ভারতে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বড় পরিসরে এলপিজি সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক হিসাবে ভর্তুকির অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এতে ভর্তুকির অর্থ নয়ছয় হওয়ার সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
পাকিস্তানও প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য মৌসুমি কর্মসূচির মাধ্যমে কম দামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করেছে।
বাংলাদেশে প্রস্তাবিত কর্মসূচির লক্ষ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমানো। তবে ভোক্তাদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে আছে সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বিশাল ব্যবধান।
একজন ভোক্তা বলেন, ‘আমরা ভোক্তা হিসেবে খুব কষ্টে আছি। সরকার নির্ধারিত দামের বদলে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সরকারি নির্ধারিত দামে আমরা কখনোই এলপিজি কিনতে পারিনি।’
ভোক্তাদের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ জানানোর পরও এলপিজির দাম বাড়াতে সক্রিয় চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ভর্তুকিতে এলপিজি সরবরাহের পাশাপাশি বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

