বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) থাকলেও বাস্তবে বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশই কোনো ধরনের দক্ষতা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। ফলে অনেক কর্মী বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ, স্বীকৃতি ও ভালো বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, বিদেশ যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন নেওয়া কর্মীদের ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো দক্ষতা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মী।
অর্থাৎ বিদেশগামীদের বড় একটি অংশ দক্ষতা ছাড়াই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। জরিপ অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মী কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন।
এর ফলে অনেক কর্মী কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। যেমন কুয়েতে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করা ফেনীর রিয়াজুল ইসলামের অভিজ্ঞতা এই সমস্যার উদাহরণ। তিনি কোনো স্বীকৃত প্রশিক্ষণ বা ইলেকট্রিশিয়ান সনদ ছাড়াই বিদেশে গিয়ে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকায় একই কাজ করেও তার আয় কম।
১৯৭৬ সালে বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সংস্থাটির অধীনে ১০৪টি টিটিসি রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আরও ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। তবে বিদেশ যাওয়ার আগে এসব কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ কর্মী।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো টিটিসির প্রশিক্ষণ ও বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে দুর্বল সম্পর্ক। সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, টিটিসিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষার্থী। বেকার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, চাকরিজীবী ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ব্যবসায়ী ৫ শতাংশ এবং গৃহিণী ৫ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির চেয়ে সাধারণ দক্ষতা অর্জনের জন্যই অনেকে টিটিসিতে আসছেন।
টিটিসির বিভিন্ন কোর্সেও এই প্রবণতা দেখা যায়। ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, সেলাই মেশিন অপারেশন, রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং এবং কম্পিউটার কোর্সে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও প্রশিক্ষণ ভাতার সুযোগের কারণে এসব কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত টিটিসিতে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে ড্রাইভিং, হাউজকিপিং, কম্পিউটার অপারেশন ও ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন কোর্সে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে চাহিদাসম্পন্ন কিছু ট্রেড, যেমন টেইলারিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, মোবাইল সার্ভিসিং ও সোলার সিস্টেমের প্রশিক্ষণ অনেক কেন্দ্রে নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএমইটি ও টিটিসির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় প্রশিক্ষণের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যেখানে বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশ প্রশিক্ষণ ছাড়াই চলে যাচ্ছে।
সিপিডির গবেষকরা মনে করছেন, গন্তব্য দেশের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ প্রদানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে কর্মীদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে টিটিসিগুলোর নিজস্ব সক্ষমতাতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। সিপিডির জরিপ অনুযায়ী, ৪০ শতাংশ টিটিসির সরঞ্জাম শিল্পের মান অনুযায়ী যথাযথ নয়। অর্ধেকের বেশি টিটিসির অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ল্যাবে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। মাত্র ৪০ শতাংশ মনে করেন প্রশিক্ষণসামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো থাকলেও কার্যক্রম সচল নেই। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আধুনিক ভবন, ল্যাব ও যন্ত্রপাতি থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন মাস ধরে নতুন প্রশিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি এবং অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহারহীন পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ালেই দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণ হবে না। বিদ্যমান টিটিসিগুলোর প্রশিক্ষণের মান, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযোগ উন্নত করতে হবে।
বর্তমানে বিদ্যমান ১০৪টি টিটিসির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে আরও ৫০টি নতুন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর জনবল, যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ মানের সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে অনেক টিটিসিতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে এবং প্রচারের অভাবে সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারছেন না।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশি শ্রমবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক আয়ের উৎস। কিন্তু দক্ষতা ছাড়া বিদেশে যাওয়া কর্মীরা কম বেতন, কাজের অনিশ্চয়তা এবং প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই ভবিষ্যতে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা নয়, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

