দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বহরে বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য সংস্থাটিকে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার অনুমোদনও দিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে ব্যয়বহুল এই নতুন প্রযুক্তির বাস পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো সক্ষমতা বিআরটিসির আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠার পর বিআরটিসির জন্য এটাই প্রথম বড় ধরনের ঋণ অর্থায়ন। তবে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদিত কোনো প্রকল্প ছাড়াই এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের বাইরে এ ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংস্থাটির পরিচালন সক্ষমতা ও প্রস্তুতি যথাযথভাবে যাচাই না করে অর্থ বরাদ্দ করা হলে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রস্তুতি শেষ না করেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিআরটিসি বর্তমানে ১ হাজার ২০০টির বেশি বাস পরিচালনা করছে। কিন্তু জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবে বিদ্যমান বহর পরিচালনাতেই সংস্থাটিকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, নতুন বৈদ্যুতিক বাস চালুর আগে কোন রুটে এসব বাস চলবে, সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা কতটা, কোথায় চার্জিং স্টেশন বসানো হবে, কোন ডিপো ব্যবহার করা হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কী ধরনের কারিগরি ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তুতি দরকার।
একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ডিসেম্বরেই যদি বাস চালুর পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সম্ভাব্যতা যাচাই, চালকদের প্রশিক্ষণ, চার্জিং স্টেশন স্থাপন, ডিপোর স্থান চূড়ান্ত করা এবং ওয়ার্কশপ প্রস্তুত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিআরটিসিকে শুধু নতুন বাস পরিচালনাকারী সংস্থা হিসেবে রেখে দিলে অতীতের মতো নতুন বাসসেবার পরিণতি হতে পারে। সফলভাবে সেবা পরিচালনার জন্য বিআরটিসিকে পরিচালন কাঠামোর দিক থেকে আরও কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
তার মতে, নতুন ও মানসম্মত বাসসেবা চালুর ক্ষেত্রে মেট্রোরেল সেবার মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে, যাতে পরিচালনা ও সেবার মান দুটোই নিশ্চিত হয়।
তবে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে ওঠা প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করেছে বিআরটিসি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০২৩ সাল থেকেই বৈদ্যুতিক বাস কেনার প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান অর্জনের জন্য বিআরটিসির একটি দল দক্ষিণ কোরিয়াও সফর করেছে।
কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ১৫টি প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা পড়েছে।
বিআরটিসি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বাসগুলো কেনার পরিকল্পনা করছে। সংস্থাটির দাবি, এ প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্রয় আইন অনুসরণ করা হবে। ক্রয় কার্যক্রম তদারকির জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা বলেন, বৈদ্যুতিক বাস চালুর প্রস্তুতি নিয়ে একাধিক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বাসগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবদুল লতিফ মোল্লা বলেন, দেশে আধুনিক বাসসেবা চালুর সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে বেসরকারি গণপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতেই প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চালক ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক বাস চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বুয়েটকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
৮০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন হলেও ঠিক কোন ধরনের বৈদ্যুতিক বাস কেনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিআরটিসি চেয়ারম্যান জানান, বিভিন্ন দেশের প্রস্তাবিত বাসের কারিগরি বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে গত দুই মাস ধরে এ বিষয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
অর্থাৎ অর্থায়নের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও বাসের ধরন, প্রযুক্তি ও চূড়ান্ত কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মূল উদ্বেগের জায়গা বিআরটিসির অতীত অভিজ্ঞতা। তাদের মতে, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে অতীতে বিভিন্ন ধরনের বাস কিনে সেবা চালু করেছে বিআরটিসি। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া কারিগরি বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করেই বাস কেনা হয়েছে। এর একটি কারণ হিসেবে সংস্থাটির নিজস্ব আলাদা কারিগরি বিভাগ না থাকার বিষয়টিও তারা উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের দাবি, চীনের সিএনজি বাস, দক্ষিণ কোরিয়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস, ভারতের সংযুক্ত বাস এবং বিআরটিসির ব্যয়বহুল ভলভো বাসসেবার মতো বেশ কিছু উদ্যোগ দীর্ঘদিন টেকেনি।
তাদের মতে, সময়ের সঙ্গে বিআরটিসির নিজস্ব বাণিজ্যিকভাবে বাস পরিচালনার সক্ষমতাও কমেছে। বর্তমানে সংস্থাটি নিজস্ব বহর পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অথচ নতুন ঋণের অর্থ শেষ পর্যন্ত বিআরটিসিকেই পরিশোধ করতে হবে।
বিআরটিসি এর আগে স্কুলবাস, সার্কুলার বাস, শাটল বাস, পর্যটন বাস ও নারী বাসসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা চালু করেছে। তবে এসবের বেশির ভাগই পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে অথবা লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
এ অবস্থায় নতুন করে ব্যয়বহুল বৈদ্যুতিক বাস বহরে যুক্ত করার আগে সংস্থাটির পরিচালন ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আরও বিস্তারিত মূল্যায়নের প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটিতে বর্তমানে ১ হাজার ৪১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। বিভিন্ন সেবা থেকে বিআরটিসি বছরে সরকারকে প্রায় ২ কোটি টাকা প্রদান করে।
ফলে ৮০০ কোটি টাকার ঋণে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয় নয়; একই সঙ্গে এটি বিআরটিসির দীর্ঘদিনের পরিচালন সক্ষমতা, অবকাঠামো, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

