প্রায় ১৫ মাস আগের কথা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভাগ করে দুটি বিভাগ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুলে-ফেঁপে ওঠে আন্দোলন। দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রায় থমকে যায়। অবশেষে সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তি প্রত্যাহার করে নিল অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ড মওকুফের আবেদনের প্রেক্ষিতে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু এই মওকুফের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গত বছরের সেই উত্তাল সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যার স্মৃতি এখনও ভোলেননি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ করদাতাও।
যাঁরা পেলেন এই সুবিধা, তাঁরা সবাই এনবিআরের মধ্য ও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তা। তালিকায় আছেন—ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল (উপকর কমিশনার, কর অঞ্চল-২১, ঢাকা), মির্জা আশিক রানা (অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-দিনাজপুর), মোনালিসা শাহরীন সুমিতা (যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-ময়মনসিংহ), মো. মামুন মিয়া (যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-যশোর), চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী (অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-গাজীপুর), সুলতানা হাবীব (অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-১২, ঢাকা), মুরাদ আহমেদ (অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-যশোর), মামুনা খাতুন (যুগ্ম কর কমিশনার, ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট ইউনিট, ঢাকা), মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন খান (যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-ফরিদপুর) ও মো. জিল্লুর রহমান। ২০২৫ সালের সেই আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত ৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এখন তাদের মধ্যে ১০ জনের শাস্তি মওকুফ হলো।
কী ছিল সেই আন্দোলন? ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জারি করে। এতে এনবিআরকে ভাগ করে দুটি পৃথক বিভাগ করার কথা ছিল। কর্মকর্তারা মনে করলেন, এতে রাজস্ব প্রশাসনের ঐক্য ভেঙে যাবে, এবং তাঁদের কর্মক্ষেত্র ও কর্মঘণ্টার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে শুরু হয় কলম ধর্মঘট, যা ধীরে ধীরে আকার নেয় পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনে। এক পর্যায়ে দেশের সব শুল্ক, ভ্যাট ও কর অফিসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনের মাত্রা এতটাই বেড়েছিল যে, একপর্যায়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। ব্যবসায়ী নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। পোশাক শিল্পের নেতারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, বন্দর থেকে পণ্য ছাড়তে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার তুলে নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের ২৯ জুন আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।
তবে আন্দোলন প্রত্যাহারের পরই শুরু হয় শাস্তির পালা। প্রথমে আন্দোলন নেতৃত্বদানকারী পাঁচ সিনিয়র কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পরে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে একদিনেই ১৪ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি হাছান তারেক রিকাবদার। সর্বশেষ এনবিআরের তিন সদস্য ও একজন কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। মোট ৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই ১০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফের অর্থ কি আন্দোলনের সব দাগ মুছে গেল? একদমই না। যাঁরা সবচেয়ে বড় শাস্তি পেয়েছেন, এনবিআরের তিন সদস্য ও যে কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাঁরা কিন্তু এখনও রয়ে গেছেন শাস্তির আওতায়। পাশাপাশি, ওই সময় বরখাস্ত হওয়া আরও অনেক কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে এই মওকুফের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে, সরকার হয়তো রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে চাইছে। কারণ এনবিআরের মতো সংস্থা যেখানে দেশের বার্ষিক রাজস্বের সিংহভাগ সংগ্রহ করে, সেখানে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই মওকুফ কি আদৌ রাজস্ব প্রশাসনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে? নাকি এটি আন্দোলনকারীদের আরও সাহস জোগাবে? অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এই সিদ্ধান্তের পর অনেকের মনে প্রশ্ন, যাঁরা বড় শাস্তি পেয়েছেন, তাঁদের জন্য কি কোনো সুযোগ রাখা হবে? আপাতত ১০ কর্মকর্তার জন্য স্বস্তি ফিরলেও, এনবিআরের অন্দরে এখনও নিস্তব্ধতা কাটেনি। সেখানে এখনও জমে আছে গত বছরের সেই উত্তাপ।

