রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা কমাতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নির্মিতব্য নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে এটি হবে বর্তমান সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প।
প্রায় ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়া। প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার। এর বড় একটি অংশ মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণ করা হবে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এই রুটে থাকবে ১৫টি স্টেশন। এর মধ্যে ১১টি থাকবে ভূগর্ভস্থ এবং চারটি থাকবে উড়ালপথে।
নতুন এই মেট্রোরেল পথটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে। এই পথ চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট, যা বর্তমানে সড়কপথের দীর্ঘ যানজটের তুলনায় অনেক কম।
প্রকল্প অনুযায়ী, শুরুতে ১৯টি ট্রেন এই পথে চলাচল করবে। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ। একেকটি ট্রেনে প্রায় এক হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি সাড়ে চার মিনিট পরপর ট্রেন চলাচল করবে।
এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগামী অর্থবছরে এর প্রথম ধাপে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াও দেড় বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুই দেশের সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মেট্রোরেল নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজের অনেকটাই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকৌশল নকশা, জমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।
ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় দুই কোটির বেশি মানুষ বসবাস করছে এবং আগামী এক দশকে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সড়কভিত্তিক পরিবহন দিয়ে মানুষের যাতায়াতের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। তাই দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের একটি অংশ চালু রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে কিছু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ শেষ হওয়ার সময় পিছিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
ঢাকার যানজট শুধু মানুষের ভোগান্তিই বাড়ায় না, এটি দেশের অর্থনীতি ও কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন লাখো মানুষ রাস্তায় দীর্ঘ সময় হারাচ্ছেন। নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি সময় সাশ্রয় হবে, দূষণ কমবে এবং রাজধানীর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নতুন এই মেট্রোরেল প্রকল্প তাই শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি ভবিষ্যতের ঢাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

