বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন—মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস—আবার চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের দুই দিনব্যাপী বার্ষিক বৈঠক। উভয় পক্ষ সম্মত হলে আগামী মাস থেকেই এই তিনটি ট্রেন পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকটি পরিচিত আন্তসরকার রেলওয়ে বৈঠক নামে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তা আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুরোনো তিনটি ট্রেন চালুর প্রস্তাবের বাইরে বাংলাদেশ এবার রাজশাহী থেকে কলকাতা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাবও তুলবে। এ ছাড়া ঢাকা-কলকাতা রুটে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেসকে যমুনা সেতুর বদলে পদ্মা সেতু দিয়ে চালানোর আগ্রহও প্রকাশ করবে বাংলাদেশ পক্ষ।
রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষও এই তিনটি ট্রেন চালুর ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামতও প্রয়োজন হবে, এবং মঙ্গলবারের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন।
উল্লেখ্য, দুই দেশ পালাক্রমে এই বৈঠকের আয়োজন করে। এর আগের বৈঠকটি গত জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কয়েক দফা পিছিয়ে যাওয়ার পর এবারের বৈঠক অবশেষে ঢাকার রেলভবনে বসছে।
পেছনের প্রেক্ষাপট বলছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নিরাপত্তাগত কারণে মৈত্রী এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত করা হয়, এবং কয়েক দিনের মধ্যেই বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও ভারতমুখী যাত্রীবাহী ট্রেন সেবা এখনো পুনরায় শুরু হয়নি।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভ্রমণ ভিসা প্রদান কার্যত সীমিত করে দেয়, আর বাংলাদেশও পাল্টা ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। ভিসাপ্রাপ্তি সহজ না হলে ট্রেনে যাত্রী পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে, যে কারণে ট্রেন চালুর উদ্যোগ এগোয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে দুই দেশই ধাপে ধাপে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার দিকে এগোচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, ঢাকা-কলকাতা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয় ২০০৮ সালের পয়লা বৈশাখে, খুলনা-কলকাতা পথে বন্ধন এক্সপ্রেস চালু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে, আর ঢাকা থেকে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত মিতালী এক্সপ্রেস যাত্রা শুরু করে ২০২২ সালের জুনে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুসহ একাধিক বিষয় আলোচনায় আসবে এবং আলোচনার ভিত্তিতেই দুই দেশ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
স্মরণযোগ্য, করোনাভাইরাসের প্রকোপের সময়ও এসব ট্রেন প্রায় ২৬ মাস বন্ধ ছিল—২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া সেই বিরতি কাটিয়ে পরে চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়েছিল। মহামারি ও গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তন-পরবর্তী সময় ছাড়া বাকি সময়ে দুই দেশের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ মোটামুটি স্বাভাবিকই ছিল।
পুরোনো তিন ট্রেন চালুর পাশাপাশি মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকছে আলোচনার টেবিলে আলাদা এজেন্ডা হিসেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ চাইছে রাতের বেলাতেও যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর সুযোগ তৈরি করতে, যেখানে বর্তমানে সব ট্রেনই দিনের বেলায় চলে। যাত্রীবাহী কোচের সঙ্গে পার্সেল বহনের জন্য অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হবে।
যাত্রীবাহী ট্রেনের বাইরে বৈঠকের একটি বড় অংশ থাকবে পণ্য পরিবহন নিয়ে। বাংলাদেশ চাইছে দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রহনপুর-সিংহাবাদ সীমান্ত রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চব্বিশ ঘণ্টা চালানোর অনুমতি, যেখানে বর্তমানে কেবল দিনের বেলাতেই এই ট্রেন চলাচলের নিয়ম রয়েছে।
প্রশাসনিক দিক থেকে আরও কিছু বিষয় আলোচনায় আসবে—যেমন রুটভিত্তিক ভিসার বদলে অন্য কোনো ভিসাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব, যাতে বিমানে ভারতে প্রবেশ করা যাত্রী চাইলে ট্রেন বা সড়কপথে ফিরতে পারেন। এ ছাড়া ভারতীয় রেলের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থ এবং রক্ষণাবেক্ষণের সময় পার হয়ে যাওয়া কিছু ওয়াগনের বিষয়টিও উঠবে আলোচনায়।
উল্লেখ্য, দুই দেশ যৌথভাবে এই যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো পরিচালনা করে এবং আয় ভাগ হয় নিজ নিজ দেশের মধ্যে অতিক্রান্ত দূরত্বের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের অংশে দূরত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আয়ের হিস্যাও বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশি। এ ছাড়া ভারতীয় ঋণে পরিচালিত রেল প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়েও কথা হবে বৈঠকে। এর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত দুটি নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য, যা সরকার পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং এখন কাজ শুরু হলেও গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। কিছু প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয় পক্ষ সরে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে, পাশাপাশি রেলের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও কথা হবে।
তবে সাধারণ যাত্রীদের কাছে এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকা এই তিনটি রেল যোগাযোগ আদৌ কবে আবার সচল হবে। এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই দুই দেশের অসংখ্য ভ্রমণকারী তাঁদের ভবিষ্যৎ যাত্রার পরিকল্পনা সাজাবেন।

