প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে এসব পদে নিয়োগের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনপ্রশাসনসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থার নিয়োগে আগে থেকেই বিভিন্ন সময় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন তারা। তবে গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো গেজেট প্রকাশ হয়নি।
বর্তমানে ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ দেয় সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিয়োগ বিধির মাধ্যমে।
সচিব কমিটির অনুমোদন পাওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের তিনটি ভাগে ভাগ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর নির্ধারণ করা হবে।
এর মধ্যে ১১ ও ১২ গ্রেডের পদে বর্তমানে ভাইভার জন্য ১০ নম্বর থাকলেও তা বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ভাইভার নম্বর বাড়ছে ৪০০ শতাংশ। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা এবং লিখিত পরীক্ষায় পাসের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর যথাক্রমে ৯০ ও ১০। নতুন বিধিমালায় তা পরিবর্তন করে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং ভাইভায় ৪০ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাসের নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
আর ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর থাকে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় উভয় পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৩ সদস্যের এই সচিব কমিটি প্রশাসনিকভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কমিটি।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসনবিষয়ক গবেষক আব্দুল আওয়াল মজুমদার মনে করেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, উচ্চ বা নিম্ন—যে গ্রেডের পদই হোক, ভাইভায় ১০ নম্বরই যথেষ্ট; সর্বোচ্চ ২০ নম্বর পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। দপ্তর-সংস্থায় নিয়োগ নিয়ে এমনিতেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে এ ধরনের সমস্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত সুশাসনের পরিপন্থী।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রায় ২০ লাখ পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের প্রায় ৬৫ শতাংশ নিয়োগ এতে প্রভাবিত হবে।
তবে শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, আনসার বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাধীন পদে এই বিধিমালা প্রযোজ্য হবে না।
ভাইভার নম্বর বাড়ানোর পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর বদলে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই নিশ্চিত করতে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরাসরি নিয়োগে বিদ্যমান পরীক্ষার নম্বর বণ্টন সংশোধন করা প্রয়োজন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, সরকার মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং এই উদ্যোগও তারই অংশ।

