বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারের নামে দুজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন নিহত ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদারের স্ত্রী সুমা আক্তার।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি এ দাবি করেন। বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে সুমা আক্তারের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি এ মামলার ২০ নম্বর সাক্ষী।
জবানবন্দির একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমা আক্তার বলেন, তাঁর দুটি মেয়ে রয়েছে এবং স্বামী হত্যার সময় তারা খুবই ছোট ছিল। ভবিষ্যতে যেন দেশে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য নিজের ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহ এবং গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেন তিনি। এ কথা বলার পর আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী।
মামলার অপর নিহত ব্যক্তি কবির মোল্লা ছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক। টিপু হাওলাদার ছিলেন উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। প্রসিকিউশনের দাবি, দুজনই আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
এদিন মামলায় গ্রেপ্তার উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাঁদের উপস্থিতিতেই টিপুর স্ত্রী সাক্ষ্য দেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ।
এর আগে গত ২০ মে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ কী
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, টিপু ও কবির ছিলেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। রাজনৈতিক বিরোধের জেরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁদের হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয় বলে দাবি করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎকালীন বরিশাল পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি মিথ্যা মামলায় টিপু ও কবিরকে উজিরপুর থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
পরে মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে গৌরনদী–গোপালগঞ্জ মহাসড়কের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে তাঁদের নিয়ে গিয়ে ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করা হয়—মামলায় এমন অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য উপাদান পর্যালোচনার পর ট্রাইব্যুনালই নির্ধারণ করবেন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না।
মামলাটির গুরুত্ব এখানেই যে, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে সেটিকে ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঘটনাগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি আটক, হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান কীভাবে যুক্ত হয়—সেটিও বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সুমা আক্তারের মঙ্গলবারের জবানবন্দি সেই অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি আসামিপক্ষের অবস্থান, অন্যান্য সাক্ষ্য এবং নথিপত্রের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত মামলার দায় নির্ধারিত হবে।

