সরকারি অফিসে গিয়ে সেবা নেওয়ার প্রয়োজন যত কমানো যাবে, দুর্নীতিও ততটাই কমে আসবে—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী। তার মতে, মানুষের অহেতুক সময় নষ্ট রোধ এবং সেবার মান বাড়াতে হলে ডিজিটালাইজেশন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের গ্রাহকদের জন্য লেনদেন আরও সহজ ও পুরোপুরি ডিজিটাল করতে সেদিন একটি নতুন কিউআর কোডভিত্তিক সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে ব্যাংকটি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান, আয়োজক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে সরকারি সেবাকে সহজ করা এবং দুর্নীতি ঠেকাতে মানুষের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই সেবাগ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্যে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
ব্যবসার খরচ কমানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বন্দর ও বিমানবন্দরের মতো জায়গায় যত বেশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা যাবে, খরচ ততই কমে আসবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা তৈরি করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়ীদের সাধারণ অভিযোগ হলো তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন, কাজে দেরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা সময়মতো পান না—প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে এই সমস্যাগুলো দূর করা জরুরি। তথ্য আদান-প্রদানের এই সক্ষমতা তৈরি হলে ব্যবসা পরিচালনা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
আয়োজক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, এই উদ্যোগ দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তার মতে, কোনো আর্থিক সেবা মানুষ গ্রহণ করবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে সেই সেবা কতটা সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ, তার ওপর। তিনি আরও বলেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা তরুণ উদ্যোক্তার কাছে প্রতি মাসে পেনশনের টাকা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল মনে হলে তাদের নিয়মিত অংশগ্রহণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে—এই নতুন কিউআর সেবা সেই জটিলতা কাটিয়ে পেনশনকে মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করবে বলে তার প্রত্যাশা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জানান, দেশে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের গ্রাহকেরা সারাদেশে প্রায় বত্রিশ লাখ ষাট হাজারের বেশি মার্চেন্ট পয়েন্টে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারছেন। জুন মাসে যেখানে দৈনিক গড়ে প্রায় আটাশ কোটি টাকার লেনদেন হতো বাংলা কিউআরের মাধ্যমে, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে একশ সাঁইত্রিশ কোটি টাকারও বেশিতে।
তিনি আরও জানান, আগামী নভেম্বরের শুরু থেকে ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেনেও বাংলা কিউআর কোড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ইউটিলিটি বিলের কপিতে এই ডায়নামিক কিউআর যুক্ত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একযোগে কাজ করছে, যা বাস্তবায়িত হলে যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সময় বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগসহ সর্বজনীন পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা খাতেও এই কিউআরভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই এই ধরনের পেনশন স্কিম চালু আছে, আর বাংলাদেশে মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে এই মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, ২০২৫ সালে দেশের মানুষের গড় আয়ু যেখানে তিয়াত্তর বছর, ২০৫০ সাল নাগাদ তা বেড়ে আশি বছরের কাছাকাছি পৌঁছাবে। ফলে ষাটোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে, আর তাদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে শরিয়াহভিত্তিক একটি পেনশন স্কিম চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
অনুষ্ঠানে আয়োজক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সরকার যে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে তাদের ব্যাংক দায়িত্ব ও সততার সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা পালন করে যাবে।

