অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার মিলছে না। কোথাও এক বস্তার বেশি দেওয়া হচ্ছে না, আবার কোথাও ডিলাররা সার বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের বেশি দামে অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগের বিপরীতে কর্মকর্তারা বলছেন, আতঙ্কে অতিরিক্ত সার কেনা ও মজুত করার কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকেরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করছেন বলেও দাবি তাদের। অন্যদিকে ডিলারদের বক্তব্য, বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তাদের পক্ষেও পর্যাপ্ত সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে বাজারে এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—সার পাওয়া যাচ্ছে, তবে বেশি দাম দিতে পারলে।
দ্য ডেইলি স্টারের অন্তত আটটি জেলার কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল সমস্যা সার একেবারেই নেই—এমন নয়। বরং সরকারি সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার সঠিক কৃষকের কাছে সঠিক দামে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উত্তরের কয়েকটি জেলায় নতুন করে কৃষকদের বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সোমবার কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে পৃথক ঘটনায় কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেন। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যান।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক আফজাল হোসেন ১৫ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। আরও তিন বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন বেগুন চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর প্রয়োজন তিন বস্তা ইউরিয়া ও দুই বস্তা ডিএপি।
আফজাল বলেন, অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে তিনি মাত্র এক বস্তা ইউরিয়া পেয়েছেন। বাকি সার অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সরকারি দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বাড়তি টাকা দিতে পারলে বাজারে সারের অভাব নেই।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ৫৫ বছর বয়সী কৃষক শামসুল আলম বলেন, আমন ধানে সার প্রয়োগের পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজির চাষের প্রস্তুতি নেওয়ায় সারের চাহিদা বেড়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় ডিলার কৃষকদের কাছে সার বিক্রি না করে অন্যত্র সরিয়ে বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করছিলেন। এ কারণে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা ওই ডিলারকে আটকে রাখেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ডিলারকে জরিমানা করে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর চা চাষি সামির উদ্দিন জানান, রোববার তাঁকে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া কিনতে হয়েছে ১ হাজার ৫৮০ টাকায়। সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একইভাবে ডিএপি কিনেছেন ১ হাজার ৪৫০ টাকায়, যেখানে সরকারি দাম ১ হাজার ১০০ টাকা।
রাজশাহী, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে ডিলারদের দাবি, এবার অস্বাভাবিকভাবে চাহিদা বেড়েছে এবং তাদের সার বিক্রিতে রেশনিং করতে বলা হয়েছে।
রৌমারীর ডিলার সাইফুল ইসলাম বলেন, চলতি মাসে তাঁর জন্য ১ হাজার বস্তা ইউরিয়া বরাদ্দ রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁকে পাঁচ ধাপে সার বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিটি কৃষককে দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ এক বস্তা করে।
তাঁর ভাষ্য, যত পরিমাণ সার বিক্রির জন্য রয়েছে, তার তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি কৃষক লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
তবে রাজশাহীর বানেশ্বরের ডিলার ও জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওসমান আলী এলাকায় সার সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে ১ হাজার ৪০টি বস্তা বা প্রায় ৫১ টন ইউরিয়া, ১ দশমিক ৫ টন ডিএপি, প্রায় ১ টন এমওপি এবং ১ দশমিক ৬৫ টন টিএসপি মজুত রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। আর গতকাল সরকারি মজুত ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার টন। এর বাইরে ডিলারদের কাছে থাকা সার এবং ইতোমধ্যে বিতরণ করা সারও রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ডিলারদের কাছে আরও ২ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টন সার রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে সার কেনার প্রক্রিয়াও চলছে।
কৃষি সচিব মো. সালিম খান সারের চাহিদা বাড়ার পেছনে রবি মৌসুমের আগে কৃষকদের আতঙ্কে অতিরিক্ত সার কেনা ও মজুত করাকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে তিনটি ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। আরও দুটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পাঁচজন কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সার বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিটি জেলায় মনিটরিং কমিটি ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অনুমোদন ছাড়া কুষ্টিয়া থেকে পরিবহন করা ২০ বস্তা সার গতকাল জব্দ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
গত ২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সার পাচারের একটি চেষ্টা ঠেকানোর কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক এবং ১১ টন সার জব্দ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আগাম জাতের শীতকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্যও কৃষকেরা আগেভাগে সার কিনছেন। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন।
কুড়িগ্রামের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনও জানান, অনেক কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার প্রয়োগ করেন। কেউ কেউ শীতকালীন সবজির জন্য আগেই সার মজুত করে রাখছেন।
বিশ্বব্যাংকের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক সারের অসম সমন্বয় ব্যবহার করেন।
তবে যেসব কৃষকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তারা আতঙ্কে সার কেনা বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, তারা প্রয়োজন অনুযায়ীই সার কিনছেন। কিন্তু সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ না পাওয়ায় বেশি দামে অন্য জায়গা থেকে কিনতে হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, সমস্যাটি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার। তাঁর মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে অনিয়ম ও দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। আবার কৃষকের আগাম সার কেনাও সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, বরাদ্দ করা সার পুরোপুরি ডিলার ও কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো বিতরণব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে।
এদিকে দেশে সারের চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হতে পারে ৫৮ লাখ টন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে দেশে সার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের সারবাজারে তার প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকছে। বিশেষ করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং চীনের সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধের কারণে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

