সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। একাদশ থেকে বিংশতম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নতুন কাঠামো প্রযোজ্য হবে, যেখানে বিভিন্ন গ্রেডভেদে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশ গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় একশ এবং মৌখিক পরীক্ষায় পঞ্চাশ নম্বর থাকবে। ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় ষাট এবং মৌখিকে চল্লিশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সপ্তদশ থেকে বিংশতম গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক দুই পরীক্ষাতেই সমান পঞ্চিশ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের অনুপাত বাড়ানো হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীদের মধ্যে নম্বরের ব্যবধান কম থাকলে, মৌখিক পরীক্ষায় কাউকে বেশি নম্বর দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে দেওয়ার একটি বাস্তব ঝুঁকি থেকে যায় বলে তাঁরা মনে করছেন।
একাদশ-দ্বাদশ গ্রেডে মোট নম্বর হবে একশ পঞ্চাশ, যার মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সমান পঁচিশ নম্বর করে বণ্টন করা হয়েছে। এই গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে পঁইত্রিশ শতাংশ এবং মৌখিকে চল্লিশ শতাংশ নম্বর পেয়ে।
ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ গ্রেডে মোট নম্বর একশ, যেখানে চারটি বিষয়ে পনেরো নম্বর করে বণ্টিত থাকবে লিখিত পরীক্ষায়। এই গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক দুই পরীক্ষাতেই পাস নম্বর ধরা হয়েছে চল্লিশ শতাংশ। আর সপ্তদশ থেকে বিংশতম গ্রেডে মোট নম্বর পঞ্চাশ, প্রতিটি বিষয়ে পাঁচ নম্বর করে বণ্টিত থাকবে, এবং এখানেও পাস নম্বরের হার চল্লিশ শতাংশ।
খসড়া বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষা নির্ধারিত থাকলে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁকে সেই পরীক্ষাতেও পাস করতে হবে।
বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন সাধারণ পদগুলোতে লিখিত পরীক্ষায় সাধারণত সাত এবং মৌখিকে তিন ভাগ নম্বর বণ্টিত থাকে। তবে সচিবালয়ের কিছু নির্দিষ্ট পদে লিখিত পরীক্ষার নম্বরের অনুপাত মৌখিকের তুলনায় আরও বেশি। নতুন প্রস্তাবে এই কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বদলে যাচ্ছে, যেখানে মৌখিক পরীক্ষার আপেক্ষিক গুরুত্ব প্রতিটি গ্রেডেই আগের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই নতুন বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আনসার, কোস্ট গার্ড বা সরকারি কর্মকমিশনের আওতাধীন পদে প্রযোজ্য হবে না।
এই পরিবর্তনের পক্ষে সরকারের মূল যুক্তি হলো, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ পরীক্ষায় বিভিন্ন প্রকার অসদুপায়ের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে—যার মধ্যে প্রক্সি পরীক্ষার্থী পাঠানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মতো ঘটনা রয়েছে। এতে প্রকৃত মেধাবী প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে সরকারি সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সামঞ্জস্য আনার প্রয়োজনীয়তাও এই পরিবর্তনের একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি গত আগস্ট মাসের শুরুতে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর কয়েক দফা পর্যালোচনার মাধ্যমে খসড়া প্রজ্ঞাপন ও তফসিল তৈরি করা হয়েছে, যা এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটিতে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সরকারের একজন উপদেষ্টা সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, এই পরিবর্তন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা বৈষম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে নয়, বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
তবে জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের একাংশ এই যুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। প্রশাসনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা একজন সাবেক সচিব ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক লেখায় মন্তব্য করেছেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বিশের বেশি বাড়ানো যুক্তিসংগত নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন সরকারের জন্য সমালোচনার কারণ হতে পারে, দুর্নীতির সুযোগ বাড়াতে পারে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লিখিত পরীক্ষায় অসদুপায় রোধের প্রচেষ্টার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েই এখন মূল প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষার প্রকৃতি অনেকাংশে বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, এর ভার বাড়লে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও একই সঙ্গে বেড়ে যেতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত বিধিমালা কী রূপে অনুমোদিত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

