ঢাকাবাসীর জন্য বড় সুখবর আসতে চলেছে। রাজধানীর পশ্চিম প্রান্ত গাবতলী থেকে পূর্ব প্রান্ত দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন একটি মেট্রোরেল লাইন (এমআরটি লাইন-৫ দক্ষিণ রুট) নির্মাণের প্রকল্প আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি পাস হলে এটি হবে বর্তমান সরকারের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতের সময় কমে দাঁড়াবে মাত্র ২৮ মিনিটে, যা ঢাকার যানজটে নাকাল নগরবাসীর জন্য এক বড় স্বস্তির খবর।
প্রকল্পের রুট ও স্টেশন সংখ্যা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি হবে পাতাল এবং চারটি উড়াল। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ, আর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ। স্টেশনগুলো হলো, গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাছিরাবাদ এবং দাশেরকান্দি। এই রুটটি মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) এবং মেট্রোরেল-১-এর সঙ্গে সংযুক্ত হবে, ফলে গোটা রাজধানী একটি সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানিয়েছেন, সব প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পটি একনেকের পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
এই প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ছিল, যা এখন অনেকটা কেটেছে। মোট ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার মধ্যে সরকার দেবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, আর বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা আসবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ হিসেবে। এডিবি ইতিমধ্যেই ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার প্রথম কিস্তি ৩০০ মিলিয়ন ডলার আগামী অর্থবছরে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই ঋণ চূড়ান্ত করতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই এবং অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফলও কম নয়। প্রতিদিন এই রুটে যাতায়াত করবেন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী। প্রতিটি ট্রেনে ধারণক্ষমতা থাকবে ২ হাজার ৩১২ জন। বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে, সড়কে গাড়ি চলাচল কমবে ১ হাজার ৪৯টি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বাতাসে ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দেখা গেছে, এর সুবিধা-ব্যয় অনুপাত ২ দশমিক ৪১ এবং অভ্যন্তরীণ রিটার্ন হার ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, যা প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রমাণ করে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চ্যালেঞ্জও কম নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেছেন, প্রকল্পটি অবশ্যই গণমুখী, তবে অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এখানে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম। প্রতিটি স্টেশনের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং পাতালপথ হওয়ায় নির্মাণ ও পরিচালনা চ্যালেঞ্জিং হবে, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রকল্পটির ইতিহাসও বেশ জটিল। ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর এমআরটি-৫ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন আটকে যায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে অনীহা দেখা যায়। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। সরকারের নির্দেশে প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক দফায় কমানো হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে তা ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়, এরপর ৪৭ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায় এবং সর্বশেষ গত ১৬ জুলাইয়ের পর্যালোচনায় আরও ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এই কমায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাদ দেওয়া এবং ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ২৩ দশমিক ০৯ একর থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ১০৪ একরে নামানো। প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, ব্যয় কমায় প্রকল্পের মান বা কাজের গুণগত মানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
সব মিলিয়ে, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পটি ঢাকার যানজট নিরসন ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। একনেকের অনুমোদন পেলে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। তবে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যেই মেট্রোরেলটি নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রকল্পটি সময়মতো ও নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে শেষ হয় কিনা এবং এর মাধ্যমে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে কিনা।

