বিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফরম জমা দেওয়ার কথা বলে ১৫ দিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের এক নবম শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু আজও ফেরেননি তিনি। তার খোঁজে উদ্বিগ্ন পরিবার, আর ঘরের ভেতর পাওয়া গেছে এক টুকরো চিরকুট, যেখানে লেখা: ‘আমার জন্য সবাই দোয়া করবে, যেন আমি যেখানে থাকি ভালো থাকি। আর কেউ আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবে না।’ মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে ইসমাইল, নামটা মনে রাখবেন। কারণ এই কিশোরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো এলাকাকে নাড়া দিয়েছে।
আরিফুল মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। বাড়ি সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের গোপালপুর ভাদুটিয়া গ্রামে। গত ২৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে নিবন্ধন ফরম জমা দিতে বলে বাড়ি থেকে বের হয় সে। সঙ্গে ছিল একটি অ্যান্ড্রয়েড ও একটি বাটন মুঠোফোন। কিন্তু দুটি ফোনেরই সিম খুলে রেখে গেছে আরিফুল। ফোনে কল দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রথমে আত্মীয়স্বজন, তারপর পাড়া-প্রতিবেশী, কোথাও খোঁজ মেলেনি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বাবা সামসুল ইসলাম।
কিন্তু এই নিখোঁজের গল্পটা একটু অন্যরকম। কারণ আরিফুল রেখে গেছে একটি চিরকুট। সেখানে সে লিখেছে: ‘আমি যেখানে আছি সে জায়গা সম্পর্কে কারোর কোনো ধারণাই নাই। আর আমার জিনিসপত্রের একটু যত্ন নিও। কেউ যদি ব্যবহার করতে চায় করুক। কাউকে না বলবা না। আর মা আমার ঘরটা অন্তত পরিষ্কার রাখবে। আমি চেষ্টা করেছিলাম আমার মায়ের ভালো ছেলে হয়ে থাকতে, কিন্তু পারিনি। হয়তোবা এটা আমার ব্যর্থতা’ এই কয়েকটি বাক্যেই যেন ফুটে উঠেছে এক কিশোরের মনখারাপের গভীরতা। ‘ভালো ছেলে হতে পারিনি’ এ কথা লিখে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া মানে কী? প্রশ্নটা থেকেই যায়।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আরিফুলের আচরণ বা পড়াশোনায় আগে থেকেই কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। তাহলে কেন এই সিদ্ধান্ত? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরিফুলের বাবা সামসুল ইসলামের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, ছেলেটির সৎ মা রয়েছে পরিবারে। মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. মনির হোসেনও একই কথা বলেছেন, পারিবারিক নিগ্রহ বা বঞ্চনার কারণেই কি না কিশোরটি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে এখানেই শেষ নয়। পুলিশ আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে আরিফুলের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করছে।
শুধু আরিফুলের গল্প নয়, বাংলাদেশে শিশু-কিশোর নিখোঁজের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের খবর পুলিশ সদর দপ্তরে এসেছে। আরিফুল কি সেই দীর্ঘ তালিকার নতুন একটি নাম? নাকি তার গল্পের মোড় অন্য কিছু? বাবা সামসুল ইসলামের একটাই চাওয়া ‘পুলিশ যদি দ্রুত তাকে খুঁজে বের করতে পারে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া’। আরিফুলের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম বলেছেন, ছেলেটি খুবই মেধাবী ছিল। মেধাবী এক কিশোরের এই নিখোঁজ, তার লেখা চিরকুটের প্রতিটি শব্দ, যেন এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল।

