ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে পড়তে চেয়েছিলেন ছোট্ট মেয়েটি। বাবা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করিয়েও দিলেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের আলাদা শিক্ষার সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতা তাঁকে ক্লাসরুমে বসতে দিল না। নিয়মের ফাঁক গলে ভর্তি হওয়া মেয়েটিকে শুধু পরীক্ষার সময় আলাদা একটি কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হতো।
শিক্ষার দরজা তখনও তাঁর জন্য পুরোপুরি খোলেনি। কিন্তু সেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়েই হয়তো তৈরি হয়েছিল অন্য এক স্বপ্ন—একদিন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের সেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন তিনি।
সেই মেয়েটিই পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি সম্ভবত হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি পাওয়া প্রথম বাঙালি নারী। তিনি রওনক জাহান—বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক, লেখক ও নারী অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষক।
রওনক জাহানের জন্ম ১৯৪৪ সালে। তাঁর শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ছোট শহরে—কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা ও মুন্সিগঞ্জে। পঞ্চাশের দশকে এসব শহরে স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর মনে জন্ম নেয় বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। তিনি পরে এক বক্তৃতায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখনই তাঁর স্বপ্ন ছিল একদিন বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া এবং বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি থেকে ডিগ্রি অর্জন করা। স্বপ্ন দেখা সহজ ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পথ সহজ ছিল না।
তাঁর পরিবার বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহন করার মতো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। তবে পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বাবা। মেয়ের পড়াশোনার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহদাতা। রওনক জাহান নিজেই বলেছেন, বিদেশে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তাঁকে নিজের যোগ্যতায় বৃত্তি অর্জন করতে হবে। তাই পড়াশোনায় অসাধারণ ফল করার লক্ষ্য নিয়েই তিনি এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ডে যাওয়ার সুযোগ পান।
তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই দেশীয় বাস্তবতার মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার আগে দেশের বিভিন্ন শহরের বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন তিনি। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ সম্পন্ন করেন। তাঁর সিভি অনুযায়ী, ইতিহাস ও অর্থনীতিও তাঁর স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যক্ষেত্রের অংশ ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীজীবন তাঁর জন্য ছিল আরেক ধরনের অভিজ্ঞতা। ষাটের দশকের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান আজকের মতো ছিল না। রওনক জাহান পরে বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে তখন মেয়েদের নীরব থাকাই যেন প্রচলিত নিয়ম ছিল। কিন্তু হার্ভার্ডে গিয়ে তাঁকে ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়—সেখানে ক্লাসে কথা বলতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, নিজের মতামত যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে হবে।
১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। গন্তব্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেটি ছিল এমন এক সময়, যখন হার্ভার্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেও নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুব কম। রওনক জাহানের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৪০ জন পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র চার-পাঁচজন। তাঁদের মধ্যেও খুব অল্পসংখ্যক নারী শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করতে পারতেন।
আরেকটি বড় বাধা ছিল ভাষা। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আসা রওনক জাহানের জন্য ইংরেজিতে ক্লাস করা, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তিনি এটিকেই নিজের শিক্ষার নতুন ধাপ হিসেবে নিয়েছিলেন। হার্ভার্ড তাঁকে শুধু নতুন একটি ডিগ্রি দেয়নি; বদলে দিয়েছিল তাঁর চিন্তার ধরনও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন, সেখানে অনেকটাই ছিল পড়া বিষয় মনে রাখা। হার্ভার্ডে তাঁকে শিখতে হয় পড়া বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে, যুক্তি খুঁজতে এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে। চার বছরের সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি কঠিন বললেও একই সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়গুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করেছেন।
১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর শুরু করেন পিএইচডি গবেষণা। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির সংকট। গবেষণাটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণও। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করা সহজ ছিল না। তবু তিনি বিষয়টি বেছে নেন।
হার্ভার্ডে তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয় যে গবেষণাপত্র, সেটিই পরে বইয়ের রূপ নেয়—Pakistan: Failure in National Integration। বইটি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি তিনি ১৯৬৮-৬৯ সালে পরিচালনা করেন; অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে। তাঁর গবেষণায় পাকিস্তানের ভেতরের পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বাঙালিদের বঞ্চনার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
১৯৭০ সালে তিনি হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। সেদিনের অনুভূতিটা তিনি পরে এভাবে বর্ণনা করেছেন—মনে হয়েছিল যেন তিনি এভারেস্টের চূড়ায় উঠে গেছেন। মাত্র কয়েক বছর আগে যে মেয়েটি ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে ক্লাসে বসার অনুমতি পেত না, সেই মেয়েই তখন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট নিয়ে বের হয়েছেন।
কিন্তু হার্ভার্ডের ডিগ্রি নিয়েই তাঁর যাত্রা শেষ হয়নি। ১৯৭০ সালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।
বাংলাদেশে নারী অধিকার ও নারী উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালে তিনি ‘Women for Women’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন—যা বাংলাদেশের প্রথম দিককার নারী বিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংগঠনগুলোর একটি। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নারী ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন।
তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে পরে আবারও যুক্ত হয় হার্ভার্ড। ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ডের Center for International Affairs ও Kennedy Institute-এ Research Associate হিসেবে কাজ করেন। এর আগে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ডের Government Department-এ Teaching Fellow ছিলেন। অর্থাৎ যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একসময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিড়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছিলেন, পিএইচডি শেষ করার পর সেখানেই গবেষক হিসেবেও কাজ করেছেন।
পরে তাঁর একাডেমিক জীবন ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, নারী ও উন্নয়ন নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরেও পরিচিতি পায়। তাঁর Pakistan: Failure in National Integration বইটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনৈতিক পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তাঁর গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হয়তো হার্ভার্ডে পৌঁছানো নয়। বরং হার্ভার্ডে পৌঁছানোর আগের গল্পটি। একটি মেয়ের জন্য যখন আলাদা করে শিক্ষার অনুমতি নিতে হতো, যখন বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়েও ক্লাসে বসার অধিকার ছিল না, তখন সেই মেয়েই নিজের জন্য এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে শিক্ষার কোনো লিঙ্গসীমা থাকবে না।
বাবার উৎসাহ, নিজের মেধা এবং বৃত্তির সুযোগ—এই তিনটি জিনিস তাঁর পথ খুলে দিয়েছিল। কিন্তু দরজা খুলে যাওয়ার পর সেই পথে হাঁটার দায়িত্ব ছিল তাঁর নিজের।
রওনক জাহান পরে তরুণীদের উদ্দেশে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার সারাংশও যেন তাঁর নিজের জীবনের গল্পেই লেখা—স্বপ্ন দেখতে হবে, বাধা এলেও সেই স্বপ্ন ধরে রাখতে হবে এবং তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ভোলার সেই ছোট্ট স্কুলে হয়তো একসময় তাঁকে ক্লাসরুমের বাইরে রাখতে চেয়েছিল সমাজ। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং সেই দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো নিজের জন্য আরেকটি দরজা খুঁজে নিয়েছিলেন। সেই দরজা ছিল হার্ভার্ডের।
আর ১৯৭০ সালে সেই দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসেন রওনক জাহান—একজন বাঙালি নারী, যিনি নিজের ভাষায় সম্ভবত হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম বাঙালি নারী।
সূত্র: facebook

