চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে নতুন করে করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ, পলাতক আসামিদের চেনেন বলে স্বীকার করলেও তাঁদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করছেন ডন। সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তাঁর কাছে মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আরও তথ্য থাকার কথা থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ‘কৌশলে’ অনেক কিছু এড়িয়ে গেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডনকে আদালতে হাজির করে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করে সিআইডি। আবেদনে বলা হয়, মামলার প্রয়োজনে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন’
সিআইডির পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান আদালতে দেওয়া আবেদনে বলেন, সালমান শাহর মৃত্যু এবং মামলার ঘটনা সম্পর্কে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তিনি অত্যন্ত কৌশলে বক্তব্য দিয়েছেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন বলে তদন্তে মনে হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ডন তাঁদের চেনেন বলে স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য তিনি দেননি।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করার কারণে ডনের কাছে মামলার ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার কথা। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে সেই তথ্যের পুরোটা পাওয়া যায়নি।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার ঘটনার আগে, ঘটনার সময় এবং পরে ডনের আচরণ ও চলাফেরা নিয়েও এমন কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা মামলার ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন তৈরি করেছে।
তবে আদালতে উপস্থাপিত এসব বিষয় তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ ও তদন্তের প্রাথমিক দাবি। এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত ঘটনা নয়।
২৯ বছর পর আত্মহত্যা থেকে হত্যা মামলা
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর মামলাটির গতিপথ বদলে যায়।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনে নিজের বাসা থেকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। তখন তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
কিন্তু শুরু থেকেই সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি হত্যার অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে মৃত্যুর ঘটনাকে আত্মহত্যা বলা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন।
তবে প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তাতেও সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। মামলার তদন্তভার পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে যায়। পিবিআইও তদন্ত শেষে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
শেষ পর্যন্ত মামলার মোড় ঘুরল
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন নীলা চৌধুরী।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এরপর সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। নতুন মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ডন এবং ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আরও কয়েকজন।
এই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
ডনের সঙ্গে সালমান শাহর সম্পর্ক
নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে সালমান শাহ ও ডন দুজনই পরিচিত মুখ ছিলেন। সালমান শাহ নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সময়ে ডন বিভিন্ন সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
পেশাগত সম্পর্কের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। আর এই সম্পর্কই নতুন হত্যা মামলায় ডনের জিজ্ঞাসাবাদকে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে বলে সিআইডির আবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গত ৯ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি।
রিমান্ড শেষে এখন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, মামলার প্রয়োজন হলে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
যে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি
সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা তিনটি পৃথক তদন্ত বা অনুসন্ধানের পরও নতুন করে হত্যা মামলা কীভাবে দাঁড়াল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ২০২৫ সালের আদালতের আদেশ এবং নতুন মামলার এজাহারে থাকা অভিযোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে নতুন তদন্তে সিআইডি কী ধরনের নতুন তথ্য বা প্রমাণ পেয়েছে, আগের তদন্তগুলোর সঙ্গে সেগুলোর পার্থক্য কোথায় এবং নতুন করে হত্যার অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নও এখন সামনে।
ডনের বিরুদ্ধে আপাতত তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ হলো, তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করছেন এবং পলাতক আসামিদের বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন না। আদালতে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
প্রায় ৩০ বছর ধরে ঝুলে থাকা সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের নতুন তদন্ত তাই এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগের তিন দফা তদন্তের সিদ্ধান্তের বিপরীতে নতুন হত্যা মামলার পক্ষে কী প্রমাণ হাজির হয়—সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

