দেশে জ্বালানি সংকট ক্রমেই তীব্র হওয়া এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম উৎপাদন ও সংযোজন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো।
আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বারবার অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল, রহিমআফরোজ, পান্না গ্রুপ, হামকো, সুপার স্টার, রিমসো ও নাভানাসহ অন্তত আটটি বড় দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী সৌরবিদ্যুৎ খাতের সহায়ক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে সৌর ইনভার্টার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। এর ফলে দেশে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ব্যাটারি সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে সরকার নতুন করে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ায় এই বিনিয়োগের গতি আরও বেড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা।
বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য যোগ করা হয়েছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ কেনার চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের প্রসারের ফলে ব্যাটারি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং গবেষণার মতো উচ্চ দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানেরও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ইতোমধ্যে নরসিংদীর পলাশে ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগে সৌর ইনভার্টার তৈরির একটি কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। গ্রুপটির বিপণন পরিচালক কামাল কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী চার মাসের মধ্যে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে।
কারখানাটিতে প্রতি মাসে ১ কিলোওয়াট থেকে ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার ১ হাজার ইনভার্টার উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারিও তৈরি করা হবে।
কামাল কামরুজ্জামান বলেন, হবিগঞ্জে আরও একটি ইনভার্টার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এরই মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রাণ-আরএফএল। বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ মেগাওয়াট। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়ালটন গ্রুপ গাজীপুরের চন্দ্রায় একটি ইনভার্টার উৎপাদন ইউনিট স্থাপনে ১১৩ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নতুন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কারখানার কাজও শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওয়ালটনের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান রাসেল।
শিল্প খাতে এই পরিবর্তনের পেছনে ভোক্তাদের আচরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রহিমআফরোজ ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান নওয়াজ আবদুর রহিম বলেন, আগে গ্রাহকেরা লোডশেডিংয়ের সময় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ পাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাকআপ ব্যবস্থা ব্যবহার করতেন। এখন অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন।

