বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্পে আট বছরের বেশি সময়েও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। এবার প্রকল্পটি নতুন করে এগিয়ে নিতে বিদেশি অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের পাশাপাশি এর ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে মূল পরিকল্পনার পাঁচ বছরের পরিবর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে সাড়ে ১২ বছর।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাব উঠতে পারে।
সভায় উপস্থাপনের জন্য তৈরি নথি অনুযায়ী, সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা বা ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাড়বে। এতে মূল ব্যয় ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির অর্থায়নে বড় পরিবর্তন আসছে ভারতের ঋণ প্রত্যাহারের কারণে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি প্রকল্পটি অনুমোদন করে। তখন সরকারের অর্থায়ন ছিল ২ হাজার ৪৩৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ভারতের তৃতীয় ঋণসুবিধার আওতায় ঋণ ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল।
এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত বিশেষ সংশোধনে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা করা হয়। তবে তখনও ভারতের ঋণের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
পরে ভারত প্রকল্পটি তৃতীয় ঋণসুবিধার তালিকা থেকে বাদ দিলে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজতে শুরু করে বাংলাদেশ। একপর্যায়ে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক প্রকল্পটিতে আগ্রহ দেখায়। এরপর বাংলাদেশ রেলওয়ে ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে বহুপক্ষীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়।
সংশোধিত প্রস্তাবে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ১৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের অর্থায়ন ৬৪৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ২৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকা হবে। পাশাপাশি ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়ার ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধির অবদান প্রায় ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এদিকে, প্রকল্প অনুমোদনের আট বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তবে নতুন অর্থায়ন কাঠামো এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের তৈরি প্রকল্পসারাংশে বড় ধরনের অর্থায়ন ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের হিসাবে প্রকল্পটির মোট ব্যয় হবে ৯২২ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ২৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং ঋণ ৬২৮ মিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকটি সরাসরি ২৮২ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ফলে প্রকল্পে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ঋণ বন্ধের সম্ভাব্য তারিখ ২০৩২ সালের জুন নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ সরকার যে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তারও প্রায় দেড় বছর পর ঋণ বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ১২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে ব্যয় ১ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮ লাখ টাকা কমানোর সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে সংশোধিত নকশা, জমির দাম বৃদ্ধি, অতিরিক্ত সেতু ও উড়ালপথ নির্মাণ, স্টেশন পুনর্নির্মাণ, বিভিন্ন সেবা সংযোগ স্থানান্তর, পুনর্বাসন এবং পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
এর সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়নও প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়েছে। মূল প্রস্তাবে এক ডলারের বিপরীতে ৮২ টাকা ৯৬ পয়সা বিনিময় হার ধরা হয়েছিল। এখন তা বেড়ে ১২২ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৬ কিলোমিটার দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এই রেলপথ চালু হলে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকার রেলপথের দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার কমবে। পাশাপাশি যাতায়াতের সময়ও প্রায় তিন ঘণ্টা কমে আসবে।
রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, মূলত ভারতীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়া এবং নতুন অর্থায়নকারী খুঁজতে গিয়ে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পিছিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সংশোধিত ব্যয়ের মধ্যে অর্থায়নের উৎস পরিবর্তন, টাকার অবমূল্যায়ন, জমির দাম বৃদ্ধি এবং নতুন নকশার মাধ্যমে চিহ্নিত বিভিন্ন কাজ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে ব্যয় বাড়লেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করেন রেলপথ সচিব। তাঁর মতে, রেলপথের দূরত্ব কমে যাওয়ায় যাত্রীদের সময় ও যাতায়াত ব্যয় কমবে, ফলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

