উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা যেন থামছেই না। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসেই জেলার নয়টি উপজেলায় পানিতে ডোবার প্রায় দুইশর কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছে বাহাত্তরটি শিশু।
সংখ্যার আড়ালে থাকা এমনই এক ঘটনা নোয়াখালী সদর উপজেলার একটি পরিবারের। স্থানীয় এক আইনজীবীর দুই মেয়ের পর জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলে সন্তানকে ঘিরে পরিবারে ছিল বাড়তি আনন্দ। কিন্তু গত শুক্রবার বাড়ির পুকুরেই ডুবে প্রাণ হারায় আড়াই বছর বয়সী শিশুটি।
জানা গেছে, শিশুটির মা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন আর বাবা গিয়েছিলেন জুমার নামাজে। মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিটের জন্য মায়ের নজরের বাইরে গিয়েছিল শিশুটি। এই স্বল্প সময়েই সে চলে যায় বাড়ির পুকুরঘাটের দিকে। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পুকুরঘাটে তার জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এরপর পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়, বরং জেলাজুড়ে চলতে থাকা এক নীরব সংকটের অংশ মাত্র। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়ায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ—সেখানে পানিতে ডোবার ছাপ্পান্নটি ঘটনায় প্রাণ গেছে তেতাল্লিশ শিশুর। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলাতেও একাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। তবে চাটখিল, বেগমগঞ্জ, সুবর্ণচর ও সোনাইমুড়ী উপজেলায় পানিতে ডোবার ঘটনা ঘটলেও সেসব ক্ষেত্রে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি বলে জানা গেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য এখনো সংকলিত হয়নি। এই দুই মাসের হিসাব যুক্ত হলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জেলার একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হলেও এককভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন ও যুব উন্নয়ন বিভাগসহ একাধিক পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, পরিবারের বাবা কর্মস্থলে চলে গেলে মা প্রায়ই গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর এই ফাঁকে শিশুরা হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায়। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা বা বিশ্বস্ত কারও তত্ত্বাবধানে শিশুদের রাখা গেলে এই ধরনের মৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক এই প্রসঙ্গে বলেন, নদী ও জলাশয়বেষ্টিত নোয়াখালী অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই উন্মুক্ত পুকুর থাকার কারণে শিশুমৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। তার ভাষায়, এই ‘নীরব মহামারি’ প্রতিরোধে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিশুদের অল্প বয়স থেকেই সাঁতার শেখানোর বিষয়টিকে জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, বরং দেশের নদী ও জলাশয়প্রধান অঞ্চলগুলোতে শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে।

