বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু এই বড় বাজারের অধিকাংশ সুবিধা চলে যাচ্ছে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর হাতে। দেশের প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এভিয়েশন বাজারের ৭৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশি এয়ারলাইনস। ফলে নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক নীতি আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিমান খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এখনো দেশের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। শক্তিশালী স্থানীয় বিমান সংস্থা, উন্নত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য ট্রানজিট সুবিধা চালু করা গেলে এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক শক্তিশালী হতে পারে।
টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক বলেন, বাংলাদেশের বিমান চলাচল বাজারের আকার প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার হলেও এর মধ্যে দেশের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
তার মতে, ঢাকাকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে দেশের বিমান খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য ট্রানজিট সুবিধা চালু করা গেলে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সময়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং মানুষের চলাচলের চাহিদা বাড়ার কারণে বিমান ভ্রমণ এখন আর শুধু বিলাসী যাত্রার মাধ্যম নয়, বরং এটি প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমান খাতের গুরুত্বও বাড়ছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে স্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত এখনো বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাব, দক্ষ পাইলট সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং সীমিত বিনিয়োগ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব সমস্যা সমাধান না হলে দেশের বিমান সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকবে এবং বাজারের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে।
তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই অবকাঠামো দেশের বিমান খাতকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সহায়তা করবে বলে তারা মনে করছেন।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সরকার বাংলাদেশের বিমান খাতকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিল মাসে শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে ৬৬ হাজার ৬৭৫টি।
২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৭৯টিতে। তবে ফ্লাইট সংখ্যা কমলেও যাত্রী সংখ্যা সামান্য বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার ৬৯০ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৫ জনে।
এতে বোঝা যায়, দেশের বিমান ভ্রমণের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু এই বাড়তে থাকা বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি হওয়ায় বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশটির বড় সুবিধা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং শক্তিশালী স্থানীয় বিমান সংস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে এজন্য শুধু বিমানবন্দর উন্নয়ন নয়, দেশের বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমানে বাংলাদেশের আকাশপথের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, নতুন উদ্যোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই চিত্র পরিবর্তনের সুযোগ এখনো রয়েছে।

