সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক পরিসরে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য থেকে শুরু করে টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে। প্রাপ্ত অভিযোগে উল্লিখিত আর্থিক লেনদেনের সব অঙ্ক একত্র করলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বলে শনিবার দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের হলো দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ। বাকি অর্থের অভিযোগ ঘিরে আছে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং ঘুস লেনদেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে পৃথক একটি অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক, যেখানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। দুদক জানিয়েছে, নতুন অভিযোগটি আগেরটির সঙ্গে যুক্ত করে সামগ্রিকভাবে অনুসন্ধান পরিচালনা করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ ঘিরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সারাদেশে জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের ক্ষেত্রে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, যার সম্ভাব্য মোট পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে দুদক।
এর পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন গ্রহণের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ আছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একটি পানি শোধনাগার প্রকল্পের একটি ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি এবং একটি ক্রীড়া অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তার নিজ উপজেলায় বাস্তবায়িত একটি অবকাঠামো প্রকল্পের বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে বড় অঙ্কের ঘুস লেনদেন এবং একটি সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ঘিরেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায়ও লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা ও তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিবের বিরুদ্ধেও ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার একান্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের কিছু ঘটনাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বিলাসবহুল জীবনযাপন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নও তোলা হয়েছে অভিযোগে।
উল্লেখ্য, এর আগেও আসিফ মাহমুদসহ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক, যেখানে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল। সেই সঙ্গে অধিদপ্তরের টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তাধীন ছিল, যা একটি পৃথক অনুসন্ধান দলের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে একাধিক মন্ত্রণালয়, একাধিক সিটি করপোরেশন, বড় উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক নিয়োগ-পদায়ন এবং চারটি দেশে অর্থপাচারের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আসায় বিষয়টি এখন ব্যাপক পরিসরে অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে বলে জানিয়েছে দুদক।
সূত্র: যুগান্তর

