প্রযুক্তির অপব্যবহারে সাইবার অপরাধের ধরন বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক, এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো প্রযুক্তি অপরাধীদের হাতে নতুন নতুন হাতিয়ার তুলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ মামলা তদন্তবিষয়ক ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স (টিওটি)’ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই উদ্যোগের তাৎপর্য হলো, এটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ কোর্স নয়, বরং সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত প্রস্তুতির একটি সংকেত।
আইজিপি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, প্রযুক্তি একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। অপরাধীরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাইবারভিত্তিক প্রতারণা, অনলাইন আর্থিক অপরাধ, তথ্য চুরি, হ্যাকিং, অনলাইনে হয়রানি ও ডিজিটাল চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ঘটাচ্ছে। এই চিত্রটি শুধু কল্পনা নয়, তথ্যই বলছে ভয়াবহতা। বিজিডি ই-গভ সার্টের (বাংলাদেশ ই-গভর্নমেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাইবার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেড়েছে, আর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে জমা পড়েছে ১৬ হাজারেরও বেশি অভিযোগ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সিআইআরটি সম্প্রতি দেশে ২৭ হাজারের বেশি ম্যালওয়্যার-সম্পর্কিত ঘটনা শনাক্ত করেছে, যা ইঙ্গিত দেয় অনেক সিস্টেম এখনো হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, প্রথাগত পুলিশিং পদ্ধতিতে সাইবার অপরাধ মোকাবেলা আর সম্ভব নয়।
এই কোর্সের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ‘প্রশিক্ষক তৈরি করার প্রশিক্ষণ’। অর্থাৎ, যারা এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তারা শুধু নিজেরাই সাইবার অপরাধ তদন্ত শিখছেন না, বরং মাঠপর্যায়ের অন্য তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করছেন। আইজিপি স্পষ্ট করেছেন, এই কোর্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রদান ও যোগাযোগ দক্ষতাও অর্জন করবেন। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা অন্যান্য তদন্তকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। কার্যকরভাবে অন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে পারলে সাইবার মামলা তদন্তকারীর সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রশিক্ষণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই ১০ দিনের কোর্সে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন, যারা পরে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এই মডেলের সুবিধা হলো, একজন প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক দশজনেরও বেশি তদন্তকারীকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন, ফলে স্বল্প সময়ে বাহিনীজুড়ে দক্ষতা ছড়িয়ে পড়বে।
আইজিপির বক্তব্যে উঠে এসেছে, সাইবার অপরাধের ধরন প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও তৈরি, এনক্রিপটেড যোগাযোগের মাধ্যমে যোগাযোগ গোপন রাখা, ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ, এসব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে পুলিশ। প্রশিক্ষণের সময়েই উঠে আসে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে অপরাধীরা ব্যবহার করছে এবং কীভাবে সেই অপরাধ শনাক্ত করা যাবে। এছাড়া অনলাইন জুয়া, ফিশিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর মতো সমস্যাও উদ্বেগের। আইজিপি আগেই বলেছেন, এসব অপরাধ এখন বড় সামাজিক সংকট, আর এগুলো মোকাবেলায় দক্ষতার বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণে তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে তদন্তকারীরা প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও অভিযুক্ত শনাক্তকরণে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন।
পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের রেক্টর (অতিরিক্ত আইজিপি) কাজী মো. ফজলুল করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কোর্সে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিআইডি প্রধান (অতিরিক্ত আইজিপি) ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন, স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডিআইজি (ট্রেনিং) মো. একরামুল হাবিব। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ডিআইজি (ট্রেনিং-২) ড. মোছা. শেহেলা পারভীন সাইবার অপরাধ তদন্ত প্রশিক্ষণের রোডম্যাপ ও বাস্তবায়ন কৌশল উপস্থাপন করেন। আইজিপি এই সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ আয়োজনের জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ট্রেনিং উইং ও পুলিশ স্টাফ কলেজ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, নিয়মিতভাবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং প্রশিক্ষণ উপকরণ ও মডিউল হালনাগাদ করতে হবে। কারণ, প্রযুক্তি বদলালে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুও বদলাতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। সাইবার অপরাধীরা যত দ্রুত প্রযুক্তি আয়ত্ত করছে, তত দ্রুত পুলিশকেও মানিয়ে নিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কোর্সটি সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ।

