ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সোমবার বিকেলে আগুন লাগার সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই ছিল তালাবদ্ধ অবস্থায়— এমন তথ্য উঠে এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে। জরুরি মুহূর্তে বের হওয়ার পথ না পেয়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনরা তালা ভেঙে বের হতে বাধ্য হন, আর এতেই ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে যে চারটি সিঁড়ি বন্ধ ছিল, যদিও ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ রাখা হয়েছিল মাত্র দুটি সিঁড়ি— তথ্যে এই গরমিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, আটতলা এই নতুন ভবনে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার হতো কেবল একটি সিঁড়ি। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালাবদ্ধ রাখা হতো। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেসব গেটের তালা এখনও ঝুলছে, কোথাও কোথাও মরিচা ধরে গেছে, আর অগ্নিকাণ্ডের পর ভাঙা গেটগুলো এখনও সেভাবেই পড়ে আছে।
হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে দায়িত্বরত একজন নার্স জানিয়েছেন, মাত্র একটি সিঁড়ি খোলা থাকায় সেখান দিয়ে নামতে গিয়েই রোগীদের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সব সিঁড়ি খোলা থাকলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না বলে তাঁর ধারণা।
হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি থাকা এক নারী রোগী জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ভবনের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করলেও গেট তালাবদ্ধ থাকায় শেষ পর্যন্ত তালা ভেঙেই বের হতে হয়। তাঁর ভাষায়, আগুনের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল কেউ হয়তো বাঁচবেন না, গেটগুলো খোলা থাকলে দুর্ভোগ অনেকটাই কম হতো।
শিশু বিভাগে ভর্তি এক শিশুর সঙ্গে থাকা এক আত্মীয় জানান, আতঙ্কিত মানুষ বিভিন্ন দিক দিয়ে নামার চেষ্টা করার সময় সিঁড়িতে পড়ে থাকা ভাঙা বেড ও বেডশিটের কারণে অনেকে আহত হন, একজনের ওপর আরেকজন পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তাঁর প্রশ্ন, একটি হাসপাতালের সিঁড়ি কেন তালাবদ্ধ থাকবে— প্রতিটি ওয়ার্ডের পাশের সিঁড়ি খোলা থাকলে মানুষ সহজেই নিরাপদে নামতে পারতেন।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে নাতনিকে নিয়ে ভর্তি থাকা আরেকজন নারীর বর্ণনায় উঠে আসে আরও ভয়াবহ চিত্র— আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় পুরো ওয়ার্ড অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর নিচে নামার কোনো উপায় না পেয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় শতাধিক মানুষ একটি কক্ষের কোণে আশ্রয় নেন। ধোঁয়ার কারণে অনেকে বমি করছিলেন, মাথা ঘুরছিল, শিশুদের শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর চিকিৎসকরা এসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেন।
হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের একজন সহকারী পরিচালক জানান, নতুন ভবনের সাতটি লিফটের একটি বিকল ছিল এবং সেটির মেরামতের কাজ চলছিল। ওই লিফটের নিয়ন্ত্রণ কক্ষেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে জানা গেছে। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিটকে আগুনের কারণ হিসেবে সন্দেহ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
তিনি আরও জানান, পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে একটি ছাড়া বাকিগুলো নিরাপত্তার কারণেই বন্ধ রাখা হতো, তবে ঘটনার পর মঙ্গলবার থেকে সেগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের একজন সহকারী পরিচালক জানান, লিফটে আগুন লাগার পর তা লিফটের হল দিয়ে বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ও আগুনের শিখা ছড়িয়ে দেয়, যা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। তাঁর মতে, সব সিঁড়ি খোলা থাকলে মানুষ আরও সহজে নামতে পারতেন, যদিও নিরাপত্তার বিবেচনায় দুটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে তিনি জানান। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা হুড়োহুড়ি হলেও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।
আগুনের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে তিনি জানান, লিফটের নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা অতিরিক্ত তাপ থেকে সূত্রপাত হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা। লিফটের কেবলে আগুন লেগে তা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি মনে করছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের স্থানীয় একজন নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, যে লিফটে আগুন লেগেছে সেটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিকল অবস্থায় বন্ধ ছিল। তবে লিফট বন্ধ থাকলেও এর বিদ্যুৎ-সংযোগ সক্রিয় থাকে, ফলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামেও সংযোগ চালু ছিল— এই বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার পরই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এই ঘটনা হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর একটি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। জরুরি নির্গমন পথ হিসেবে বিবেচিত সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে বন্ধ সিঁড়ির সংখ্যা নিয়ে অসামঞ্জস্য— উভয় বিষয়ই নির্দেশ করে যে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জরুরি প্রস্তুতি পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে এ ধরনের স্থাপনায় সব জরুরি নির্গমন পথ সব সময় সচল রাখা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

