দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে চীন ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা।
বুধবার এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই তেল আমদানি হবে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে। অর্থাৎ প্রচলিত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করা হবে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে কত পরিমাণ তেল আমদানি করা হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
সাধারণত দেশে বা আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ সরবরাহ সংকট তৈরি হলে দ্রুত জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরকার এই বিশেষ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে চলমান অবরোধ পরিস্থিতি এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোতে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তেলের দাম আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আগাম ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি তেল আমদানির পথ বেছে নিয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিও এই উদ্যোগে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
এ ছাড়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন গ্যাস তেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে আগস্ট মাস থেকে সরকার একই পদ্ধতিতে একাধিকবার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানি করেছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি আমদানিতে সাধারণত সরাসরি ক্রয় এবং উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সমান অনুপাতে, অর্থাৎ ৫০:৫০ ভিত্তিতে জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়। তবে বুধবারের সিদ্ধান্তে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক ও পেট্রো চায়না এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএসপি এই পরিশোধিত তেল সরবরাহ করবে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করা তেলের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হয়। কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্প খাতের বড় অংশই জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের সমস্যা হলে এর প্রভাব সরাসরি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে পারে।
তবে সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আরও টেকসই কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারের এই উদ্যোগ মূলত দেশের জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট বাড়লেও যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা পূরণে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যেই এই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

