দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন এক বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা হয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রশাসনিক একক ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত—সব স্তরের ভবনের ছাদে এখন বাধ্যতামূলকভাবে বসাতে হবে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। শুধু প্রধান দাপ্তরিক ভবনই নয়, এই নির্দেশনার আওতায় পড়ছে মিলনায়তন, ডাকবাংলো এবং হাটবাজারের স্থায়ী শেডও।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দ্বিমুখী লক্ষ্য। একদিকে প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চাহিদা মেটাবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয়ের নতুন একটি উৎসও তৈরি করতে পারবে তারা। চলতি মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো পৃথক পৃথক চিঠিতে এই নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এবং সঙ্গে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবস্থা রাখার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর আওতায় থাকবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ—অর্থাৎ স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিটি স্তর। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্দেশনায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টিকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এই মাসের শুরুর দিকের একটি প্রজ্ঞাপনের সূত্র উল্লেখ করে চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, দেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই ব্যবস্থা নিতে হবে।
সিটি করপোরেশনগুলোর ক্ষেত্রে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিজস্ব ভবন, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয় ও বাসভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো এবং অতিথিশালার ছাদে সৌর প্যানেল বসাতে হবে। এ ছাড়া করপোরেশনের অধীন মার্কেট ও হাটবাজারের স্থায়ী শেডেও আয়তন বিবেচনা করে এই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নির্দেশনা প্রযোজ্য—নিজস্ব ভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো এবং অধীনস্থ বাজারের স্থায়ী স্থাপনা এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ছে। উপজেলা পর্যায়ে পরিষদ ভবনের পাশাপাশি নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের বাসভবন, কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং অধীনস্থ হাটবাজারের শেডেও প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্তর ইউনিয়ন পরিষদের ভবনগুলোতে এই নির্দেশনা কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তারা নিজেদের রাজস্ব আয় বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ থেকে এই ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তারা বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করবে, যার জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগ সরকারের সামগ্রিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এই মাসের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য একটি বিশেষ মূল্য প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যেখানে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হলে প্রতি ইউনিটে সাড়ে দশ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিশেষ দাম পাওয়ার জন্য ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের মধ্যে সিস্টেম স্থাপন সম্পন্ন করতে হবে, নির্ধারিত সময়ের পর এই সুবিধা মিলবে না। এই বিশেষ দরে বিদ্যুৎ কেনার এই ব্যবস্থা চলবে ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, এবং বিক্রি করা বিদ্যুতের অর্থ প্রতি তিন মাস পরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
সরকারি ভবনের ছাদ কাজে লাগানোর এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। এর আগেও দেশের সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের একটি জাতীয় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও এই উদ্যোগকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, পাশাপাশি ভবনের প্রকৃত কারিগরি সক্ষমতা যাচাই এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল সেখানে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ ব্যবহার করার এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে আলাদাভাবে কোনো জমি বা স্থান বরাদ্দ না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দিনের বেলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপ্তরিক চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমবে বলে তাদের ধারণা।
তবে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালকের মতে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে ভবনের ছাদের কারিগরি উপযোগিতা যাচাই করা এবং নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্যানেল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ও দক্ষ জনবল বরাদ্দ রাখতে হবে, তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগের সুফল পূর্ণভাবে পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগে একটি পৃথক তদারকি সেল গঠন করা উচিত, যা নিয়মিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করবে—কোন প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে, কোথায় তা সম্পন্ন হয়েছে, কতটা বিদ্যুৎ নিজেরা ব্যবহার করছে এবং কতটা গ্রিডে যাচ্ছে। তার মতে, এই তথ্য জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সামগ্রিকভাবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো এবং সরকারি ব্যয় কতটা সাশ্রয় হলো, তা সহজেই বোঝা সম্ভব হবে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা একদিকে বিদ্যুৎ সংকটের সময় স্থানীয় সরকারি সেবা নির্বিঘ্নে চালু রাখতে সহায়তা করবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় কমিয়ে তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতাও বাড়াতে পারে। তবে এর সফলতা মূলত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণগত মান, নিয়মিত তদারকি এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার ওপর।

