বাংলাদেশে ধান ও চালের বাজারে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের গুদামগুলোতে চালের মজুত বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষক উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আবার সাধারণ ভোক্তাও বাজারে চালের দামে প্রত্যাশিত স্বস্তি পাচ্ছেন না।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুই লাখ টন চাল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ১৫ হাজার টন চালের বরাদ্দপত্র দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বাড়তি চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছেন কারা?
কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষক মাঠে ধান উৎপাদন করলেও সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় সরাসরি তার অংশগ্রহণ সীমিত। অন্যদিকে চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে সরকারের কাছে বেশি দামে চাল বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন।
অতিরিক্ত চাল কেনার প্রয়োজন কেন তৈরি হলো?
গত বোরো মৌসুমে চালকল মালিকরা কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে মজুত করেন। ধানের দাম তুলনামূলক কম থাকায় তারা বড় পরিমাণে ধান সংগ্রহ করে রাখেন।
পরবর্তীতে বাজারে চাল সরবরাহ এবং সরকার নির্ধারিত পরিমাণ চাল গুদামে দেওয়ার পরও তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থেকে যায়।
এই অতিরিক্ত চাল এখন সরাসরি বাজারে না এসে সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রমের মাধ্যমে গুদামে যাচ্ছে। ফলে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ছে না। বাজারে এসব চাল সরাসরি এলে সাধারণ মানুষের জন্য চালের দাম কিছুটা কমতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বোরো মৌসুম শেষ হয়ে আউশ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে, মাঠে রয়েছে আমন ধান। কিন্তু সরকার এখনো মূলত বোরো ধানের চাল সংগ্রহ করছে।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি চাল সংগ্রহ
চলতি বোরো মৌসুমে সরকার পাঁচ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং এক লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
কিন্তু ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ধান সংগ্রহ হয়েছে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন। সেদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ টন এবং আতপ চাল সংগ্রহ হয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৬৪৭ টন।অর্থাৎ ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই সংগ্রহের বড় অংশ সরবরাহ করেছেন চালকল মালিকরা। ধানের একটি অংশ বড় কৃষকরা সরবরাহ করলেও অধিকাংশ চাল এসেছে মিল মালিকদের কাছ থেকে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত চাল বিক্রির জন্য প্রায় ৮৫০ জন চালকল মালিক আবেদন করেছেন। এর মধ্যে দেড় শতাধিক আবেদনকারীর সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধা-সরকারি সুপারিশপত্রও যুক্ত রয়েছে।
গুদাম ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি মজুত
সরকারি গুদামের বর্তমান পরিস্থিতিও বাড়তি চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৭ টন।
অন্যদিকে সরকারি গুদামের কার্যকর সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ ৯৫ হাজার টন।অর্থাৎ গুদামের ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪৪ হাজার টন বেশি খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।এই অবস্থার মধ্যেই আরও প্রায় দুই লাখ টন চাল কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর আগে সরকার ২০ লাখ ২৩ হাজার ২৯৩ টন চাল সংগ্রহ করেছে।
কৃষকের বদলে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন মিল মালিকরা?
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বর্তমান ধান-চাল সংগ্রহ ব্যবস্থায় কৃষক সরাসরি যতটা লাভবান হওয়ার কথা, বাস্তবে তা হচ্ছে না।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, সরকারি ব্যবস্থায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের পরিমাণ কম। বরং চাল সংগ্রহ করা হয় বেশি, যার প্রধান সরবরাহকারী চালকল মালিকরা।
তার মতে, আর্দ্রতা, মান যাচাইসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অনেক সময় কৃষকের ধান সরকারি গুদামে নেওয়া হয় না। তখন কৃষক বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে বা চালকল মালিকদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করেন।
এরপর সেই ধান প্রক্রিয়াজাত করে চালকল মালিকরা সরকারের কাছে চাল সরবরাহ করেন। এতে কৃষকের পরিবর্তে মধ্যবর্তী পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগ তৈরি হয়।
কম দামে ধান কিনে বেশি দামে চাল বিক্রির সুযোগ
চলতি বোরো মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে কিনেছে। অন্যদিকে ধানের সরকারি সংগ্রহমূল্য ছিল ৩৬ টাকা।
২০২৪ সালের বোরো মৌসুমে সেদ্ধ চালের সংগ্রহমূল্য ছিল ৪৫ টাকা এবং ধানের মূল্য ছিল ৩২ টাকা।অর্থাৎ এবার সরকারি সংগ্রহমূল্য আগের তুলনায় বেশি ছিল।
তবে বাজারে ধানের দাম কম থাকায় চালকল মালিকরা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুত করেন। পরে সেই ধান চাল হিসেবে সরকারের কাছে বিক্রি করার সুযোগ পান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজি চালে প্রায় তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত লাভ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।অন্যদিকে এই চাল যদি সরাসরি বাজারে আসত, তাহলে সাধারণ ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারতেন।
ভালো ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই
বোরোর পর এবার আউশ ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক এলাকায় ধানের দাম কমে গেছে।
নওগাঁর মহাদেবপুরে বর্তমানে আউশ ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায়। অথচ গত বছর একই সময়ে দাম ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, গত বছর ধানের দাম পরে বেড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল। কিন্তু এবার শুরু থেকেই দাম অনেক কম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আউশ ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪০ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তা পূরণের আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়ছে না। বোরো ও আউশ—দুই মৌসুমেই কৃষক ভালো দাম পাওয়ার সংকটে রয়েছেন।
সরকারি ব্যবস্থায় কৃষকের অংশগ্রহণ কম
দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি।কিন্তু সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নিবন্ধিত কৃষকের সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩ জন।অন্যদিকে নিবন্ধিত চালকলের সংখ্যা ছয় হাজার ৩০১টি।এই ব্যবধানই দেখায়, সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
কৃষকদের সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে হলে নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, নির্দিষ্ট আর্দ্রতা এবং নানা শর্ত পূরণ করতে হয়। এরপর যাচাই-বাছাই ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া পার হতে হয়।অনেক কৃষকের জন্য এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও জটিল হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষকের জন্য সংগ্রহ ব্যবস্থা আরও সহজ করা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিবন্ধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে কৃষক সরাসরি সরকারি সুবিধা পেতে পারেন।
বন্ধ মিল থেকেও চাল সরবরাহের প্রশ্ন
অতিরিক্ত চাল কেনার পাশাপাশি সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় চুক্তিবদ্ধ কিছু চালকলের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, এমন কিছু মিলও সরকারি সংগ্রহে অংশ নিচ্ছে, যারা আগে নির্ধারিত সময়ে এক হাজার টন চালও সরবরাহ করতে পারেনি। এমনকি দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা কম থাকা কিছু মিল বড় পরিমাণ চাল সরবরাহের জন্য আবেদন করেছে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কয়েকটি চালকলের সঙ্গে সরকারি চাল সরবরাহের চুক্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চান্দাইকোনার আনোয়ারা সেমি অটো চালকল এক যুগের বেশি সময় ধরে বন্ধ। সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা উৎপাদনের ব্যবস্থা নেই। অথচ চলতি বছর ওই মিল থেকে ১১৯ টন চাল কেনার চুক্তি হয়েছে।অভিযোগের ভিত্তিতে রায়গঞ্জের পাঁচটি মিলের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক।
ভবিষ্যতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার চিন্তা
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে চাল সংগ্রহ করলে বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজন কমে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়।
তবে কৃষকের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে আর্দ্রতাসহ কিছু কারিগরি সমস্যা রয়েছে। এ কারণে মৌসুম শেষ হওয়ার এক থেকে দুই মাস পর কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার একটি নতুন নীতি করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এতে কৃষক ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং সরকার সরাসরি তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের সুযোগ পাবে।বাংলাদেশে চালের উৎপাদন, সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার এই চিত্র দেখাচ্ছে—শুধু বেশি উৎপাদন করলেই কৃষক লাভবান হন না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদক কৃষক এবং সাধারণ ভোক্তা—দুই পক্ষই ন্যায্য সুবিধা পান।

