“সবার আগে বাংলাদেশ” গড়তে হলে আগে মানসম্মত শিক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে শ্রমজীবী মানুষের উত্থান, ইনসাফ ও নতুন বন্দোবস্তের কথা কেবল স্লোগানই থেকে যাবে। এমন মন্তব্য করেছেন নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে এক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। সংলাপটি যৌথভাবে আয়োজন করে সিপিডি ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। আলোচনার বিষয় ছিল “সরকার কি প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত”। এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম। প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন তিনটি বড় সমস্যায় ভুগছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিলেও পাস করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেখানে শিক্ষার্থী মিলছে না। তৃতীয়ত, সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চাইছেন না। তাঁর মতে, এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ বলতে গেলে সবার আগে মানসম্মত শিক্ষার বাংলাদেশ চাই। যাঁরা শ্রমজীবী মানুষের উত্থানের কথা বলেন, সেই উত্থান আসবে তাঁদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। পিছিয়ে পড়া মানুষের সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষার জায়গা করে দিতে হবে। যাঁরা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেন, সেটি হতে হবে শিক্ষার অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আর ইনসাফের প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে বড় অন্যায় আর কিছু হতে পারে না।
সিপিডির নবনিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, লিঙ্গবৈষম্য সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগ ও অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের স্কোর প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়ের সমতা নিশ্চিত হলেও ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সুযোগের মধ্যে এখনো বড় ফারাক আছে।
তাঁর মতে, শুধু স্কুলে উপস্থিতি বাড়ালে শিক্ষার মান ও জীবনদক্ষতা নিশ্চিত হয় না। জিপিএনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা, যেমন বিতর্ক ও খেলাধুলা, অর্জন করাতে হবে। অভিভাবকদেরও জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মানসিকতা ছাড়তে হবে। কারণ জিপিএ-৫ একজন শিশুর মেধা বা যোগ্যতার পূর্ণ চিত্র দেয় না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি, বিদ্যালয়ের সুবিধা ও ছেলেমেয়ের সমতায় বাংলাদেশ ভালো সাফল্য দেখিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই অগ্রগতি থমকে গেছে। বন্যা ও কোভিডের মতো বড় ধাক্কায় শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ধরা পড়েছে।
এখন শিক্ষা খাতের মূল সংকট হলো বিভিন্ন ধারার মধ্যকার বিভাজন। প্রতিষ্ঠান ও সনদের মান সমান না হওয়ায় শিখনফল ও শিক্ষার গুণগত সুযোগে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সরকার ক্ষমতা নেওয়ার ২০০ দিন পার হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যালোচনা করেছেন গবেষকেরা। তাঁরা তিনটি দিক খতিয়ে দেখেছেন:
- নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি
- ইশতেহারের বাইরে নেওয়া নীতি ও পরিকল্পনা
- বাজেটে এসব রাজনৈতিক অঙ্গীকারের যথাযথ প্রতিফলন হয়েছে কি না
সিপিডির মতে, শুধু প্রাথমিক স্তরে প্রবেশের সুযোগ বাড়ালে চলবে না। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত মাঠপর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা বা সাধারণ বাজেট বরাদ্দে শিক্ষায় সার্বিক পরিবর্তন আসবে না। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তার যথাযথ ব্যবহারে জোর দিতে হবে। ঘোষিত নীতিগুলোকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে দ্রুত বাস্তবায়নও জরুরি।
বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। সংকট শুধু স্কুলে ভর্তির সংখ্যায় নয়, শেখার মান, শিক্ষকের যোগ্যতা এবং ধনী-দরিদ্র ও বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীদের সুযোগের ফারাকে। দেবপ্রিয়ের তোলা তিন সমস্যা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। মেধাবীরা শিক্ষকতায় না এলে শেখার মান বাড়ে না। মান না বাড়লে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থাও বাড়ে। এই চক্র ভাঙতে বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা ও আকর্ষণ বাড়ানোর নীতিও দরকার হবে। তবে এই বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে করা, সংলাপে এ নিয়ে আলাদা সুপারিশ উল্লেখ করা হয়নি।

