প্রতি বছরই ঢাকায় একটি পরিচিত বিতর্ক ফিরে আসে—রাজধানীর রাস্তা থেকে রিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে কি না। যানজট কমানোর যুক্তিতে বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০২৪ সালের মে মাসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানীর রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু চালকদের প্রতিবাদের মুখে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়। একই বছরের নভেম্বরে উচ্চ আদালত ঢাকার রাস্তা থেকে এসব যানবাহন সরানোর নির্দেশ দেন। তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই আপিল বিভাগ সেই নির্দেশ স্থগিত করেন। ২০২৫ সালেও আবার নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ২০২৬ সালের আগস্টে সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে আটটি অঞ্চলে ভাগ করে রিকশা নিবন্ধন, চালকদের অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে চলাচলের পরিকল্পনা করে।
এই পরিবর্তন একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—রিকশার সমস্যা শুধু আইন করে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো সাধারণ সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শহরের অবকাঠামো, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের বাস্তব প্রয়োজন।
কোনো একটি পরিবহন ব্যবস্থা যদি মানুষের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয়, তাহলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেটিকে তুলে দেওয়া যায় না। তার আগে তৈরি করতে হয় কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা। তা না হলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং নতুন সংকট তৈরি হয়।
ঢাকার যানজট একটি গুরুতর সমস্যা। ব্যাটারিচালিত রিকশারও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু যানজট কমানোর নামে এমন একটি পরিবহন ব্যবস্থা সরিয়ে দেওয়া, যার ওপর লাখ লাখ মানুষ নির্ভর করেন, বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে না।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো জায়গার অভাব। শহরের মোট ভূমির আট শতাংশেরও কম অংশ রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা বড় আকারের বাস চলাচলের জন্য উপযোগী। বাকি অংশজুড়ে রয়েছে অসংখ্য সরু রাস্তা, গলি এবং স্থানীয় সংযোগ পথ।
বিশেষ করে পুরান ঢাকার মতো এলাকায়, যেখানে রাস্তার কাঠামো পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়নি, সেখানে বড় যানবাহন অনেক সময় পৌঁছাতেই পারে না। এসব এলাকায় রিকশা শুধু একটি বাহন নয়, বরং মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা। অনেক ছোট দূরত্বের যাত্রায় রিকশা এমন একটি সুবিধা দেয়, যা অন্য কোনো পরিবহন দিতে পারে না।
রিকশা সরিয়ে রাস্তা খালি করার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সেই খালি জায়গা কার জন্য তৈরি হবে? সাধারণ মানুষের জন্য, নাকি সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য?
ব্যক্তিগত গাড়ি তুলনামূলক কম যাত্রী বহন করলেও রাস্তার বড় অংশ ব্যবহার করে। অন্যদিকে রিকশা অনেক বেশি মানুষকে ছোট দূরত্বে পরিবহন করে এবং তুলনামূলক কম জায়গা দখল করে। তাই শুধু রাস্তা খালি করার যুক্তিতে রিকশা সরানোর সিদ্ধান্ত নিলে শহরের পরিবহন বাস্তবতা পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
ঢাকায় হাঁটার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি উন্নত শহরে ছোট দূরত্বের যাত্রার জন্য হাঁটা স্বাভাবিক ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা হলো, মানুষ অনেক সময় ভালো পরিবেশের কারণে নয়, বাধ্য হয়ে হাঁটেন।
অনেক এলাকায় ফুটপাত নেই। যেখানে রয়েছে, সেগুলোর অনেক অংশ ভাঙা, দখল করা অথবা গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে পথচারীরা নিরাপদ জায়গা ছেড়ে মূল সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন।
একটি পুরো শহরকে হাঁটার উপযোগী করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত আলো, পথচারীবান্ধব রাস্তা এবং সঠিক নগর পরিকল্পনা ছাড়া শুধু মানুষকে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
যতদিন পর্যন্ত এই পরিবর্তন না আসে, ততদিন পর্যন্ত রিকশা বাসা, গলি এবং স্থানীয় এলাকার সঙ্গে বড় সড়ক বা গণপরিবহনের সংযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেই থাকবে।
ঢাকার পরিবহন সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হলো দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা। বিশাল জনসংখ্যার এই শহরে এখনো এমন একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হয়নি, যা মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ এবং আরামদায়ক সেবা দিতে পারে।
বাস ব্যবস্থা অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন এবং অনিয়ন্ত্রিত। অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়মিত চলাচল, নিরাপত্তার অভাব এবং যাত্রীবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি অনেক মানুষকে বিকল্প পরিবহনের দিকে ঠেলে দেয়।
বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী, শিশু এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য বাস ব্যবহার অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বাসের উচ্চ সিঁড়ি, অতিরিক্ত ভিড় এবং চলন্ত অবস্থায় ওঠানামার মতো বিষয়গুলো তাদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করে।
ঢাকার গড় যান চলাচলের গতি বর্তমানে ঘণ্টায় প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটারে নেমে এসেছে। অনেক মানুষ প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় রাস্তায় হারান। এমন পরিস্থিতিতে এক বা দুই কিলোমিটার দূরত্বের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে বাসে ওঠা অনেকের কাছে যুক্তিসংগত মনে হয় না।
বিশেষ করে নারীদের জন্য যাতায়াতের বিষয়টি আরও জটিল। ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
এই বাস্তবতায় অনেক নারীর কাছে পরিবহন নির্বাচন শুধু সময় বা খরচের বিষয় নয়, নিরাপত্তার বিষয়ও। রিকশা অনেক নারীকে তুলনামূলক ব্যক্তিগত জায়গা এবং সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা দেয়। ভিড়যুক্ত বাস এড়িয়ে অনেকেই রিকশাকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যাটারিচালিত রিকশার বর্তমান অবস্থা গ্রহণযোগ্য। বরং এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কয়েক লাখ থেকে শুরু করে ৪০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়। এই বিশাল পার্থক্য দেখায় যে খাতটি এখনো সঠিকভাবে হিসাবের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।
ঢাকায় ২০২৪ সালের আগস্টের পর ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে চলাচলকারী প্রায় ৯৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধনবিহীন।
নিরাপত্তার দিক থেকেও উদ্বেগ রয়েছে। সাধারণ রিকশার কাঠামোর সঙ্গে মোটর যুক্ত করে যানবাহনের গতি বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্রেক, আলো এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের কারণে শিশুদের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রার সিসার উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
প্রথমে জানতে হবে ঢাকায় কত রিকশা চলছে, কারা চালাচ্ছেন এবং কী ধরনের যান চলাচল করছে। নিবন্ধন, চালকদের অনুমোদন, নিরাপদ নকশা এবং বৈধ চার্জিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের জন্য নিরাপদ নকশার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে উন্নত ব্রেক ব্যবস্থা, নির্ধারিত গতি, নির্দিষ্ট আকার এবং প্রয়োজনীয় আলো ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এসব মান বাধ্যতামূলক করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
রিকশাকে গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মেট্রোরেল স্টেশন বা বড় পরিবহন কেন্দ্রের সঙ্গে আশপাশের এলাকার সংযোগ তৈরিতে নিয়ন্ত্রিত রিকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বড় সড়কগুলোতে যান চলাচল সহজ করতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে যে মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প পরিবহন রয়েছে। ভালো বাস ব্যবস্থা তৈরি হলে ধীরে ধীরে বড় সড়ক থেকে ধীরগতির যান কমানো সম্ভব।
ঢাকার রিকশা সমস্যা আসলে শুধু একটি যানবাহনের সমস্যা নয়। এটি একটি শহরের পরিকল্পনা, মানুষের নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।
রিকশাকে সরিয়ে দেওয়ার আগে এমন একটি শহর তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ সহজে, নিরাপদে এবং সাশ্রয়ে চলাচল করতে পারে। বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হলে রিকশার প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
কারণ একটি শহরের সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং আরও ভালো পথ তৈরি করা।

