বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর বাংলাদেশে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার পর একটি অংশ শুরুতেই কেটে যাওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের আগেই টাকা কমে যাচ্ছে কেন?
এর সঙ্গে রয়েছে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট। ফলে একজন গ্রাহক এক ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও সংযোগ সচল রাখার জন্য কিছু নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। আর এখান থেকেই প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যুৎ না পেলেও কিংবা ব্যবহার না করলেও এই অর্থ কেন দিতে হবে?
জুন ২০২৬ থেকে নতুন খুচরা বিদ্যুৎ ট্যারিফ কার্যকর হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি হলে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আবাসিক গ্রাহকদের ডিমান্ড চার্জ আগের মতোই প্রতি কিলোওয়াটে মাসে ৪২ টাকা রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগও স্বীকার করেছে, জুনে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর অনেক গ্রাহকের বিল আগের তুলনায় বেড়েছে এবং অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তদন্ত করতে বিতরণ সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের বিল আসলে কী কী দিয়ে তৈরি?
একজন আবাসিক গ্রাহকের বিল শুধু ব্যবহৃত ইউনিটের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নির্ধারিত এনার্জি চার্জের সঙ্গে যোগ হয় অনুমোদিত লোড অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জ। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে থাকে মিটার ভাড়া বা মিটারের কিস্তি, ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আগের বকেয়া থাকলে বিলম্ব মাশুল।
পোস্টপেইড গ্রাহকের বিলে সাধারণত এসব খাত আলাদাভাবে দেখা যায়। কিন্তু প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের সময় নির্দিষ্ট চার্জগুলো আগে সমন্বয় করে বাকি অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে যোগ হয়।
এ কারণেই একজন গ্রাহক ৫০০ টাকা রিচার্জ করলেও পুরো ৫০০ টাকার বিদ্যুৎ পান না। কত টাকা কাটা হবে, তা নির্ভর করে তার অনুমোদিত লোড, মিটারের ধরন, ওই মাসের নির্দিষ্ট চার্জ আগে পরিশোধ হয়েছে কি না এবং অন্য কোনো বকেয়া রয়েছে কি না তার ওপর। ডিপিডিসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একাধিক মাস রিচার্জ না করলে পরবর্তী রিচার্জের সময় আগের মাসগুলোর ডিমান্ড চার্জও একসঙ্গে সমন্বয় হতে পারে।
ডিমান্ড চার্জ আসলে কী?
ডিমান্ড চার্জ হলো গ্রাহকের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার একটি স্থায়ী চার্জ।
এর পেছনে যুক্তি হলো—গ্রাহক কোনো মাসে খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও তার অনুমোদিত লোড অনুযায়ী ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন, সাবস্টেশনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সক্ষমতা প্রস্তুত রাখতে হয়।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ প্রযোজ্য। ফলে ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একটি বাসায় মাসিক ডিমান্ড চার্জ ৮৪ টাকা। ১০ কিলোওয়াট হলে ৪২০ টাকা।
কোনো গ্রাহকের অনুমোদিত লোড ১৫ কিলোওয়াট হলে শুধু ডিমান্ড চার্জই দাঁড়ায়—
১৫ × ৪২ = ৬৩০ টাকা।
এই গ্রাহকের যদি বিতরণ সংস্থার দেওয়া থ্রি-ফেজ প্রিপেইড মিটার থাকে এবং ২৫০ টাকা মিটার চার্জও প্রযোজ্য হয়, তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের আগেই মাসে দুটি খাতে ৮৮০ টাকা দিতে হতে পারে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে আসে। অনেক গ্রাহক সংযোগ নেওয়ার সময় প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অনুমোদিত লোড নিয়েছেন অথবা লোডের অর্থ কী, তা পুরোপুরি বুঝে ওঠেননি। পরে প্রতি মাসে সেই বেশি লোডের ওপরই ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও কেন ডিমান্ড চার্জ?
গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি এখানেই।
ধরা যাক, একটি পরিবার এক মাস বাড়িতে ছিল না। তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় শূন্য। তারপরও সংযোগ সচল থাকলে অনুমোদিত লোড অনুযায়ী ডিমান্ড চার্জ প্রযোজ্য হবে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার যুক্তি হলো, গ্রাহক যখনই চাইবেন, অনুমোদিত লোড পর্যন্ত বিদ্যুৎ দেওয়ার সক্ষমতা তাদের প্রস্তুত রাখতে হচ্ছে। ফলে এটি বিদ্যুতের ব্যবহারমূল্য নয়, বরং সংযোগ ও সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার খরচ।
কিন্তু ভোক্তা ও কিছু বিশেষজ্ঞ এখানেই পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন—যদি নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে সেই প্রতিশ্রুত সক্ষমতা সারাক্ষণ পাওয়া না যায়, তাহলে পুরো ডিমান্ড চার্জ নেওয়া কতটা ন্যায্য?
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের বক্তব্য হলো, বিতরণ সংস্থাকে পরিষ্কারভাবে দেখাতে হবে ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ প্রস্তুত রাখার জন্য তাদের অতিরিক্ত ব্যয় কত হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের ভিত্তিতেই চার্জ কতটা যৌক্তিক।
বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীর পর্যবেক্ষণও একই জায়গায়। তার মতে, গ্রাহককে যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ দেওয়া না যায়, অথচ পুরো মাসের ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রাহকের মধ্যে অস্বস্তি ও অনাস্থা তৈরি হয়।
মিটার ভাড়া কেন?
প্রিপেইড মিটারের আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো মাসিক মিটার চার্জ।
বর্তমান ব্যবস্থায় বিতরণ সংস্থার দেওয়া সিঙ্গেল-ফেজ প্রিপেইড মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের জন্য ২৫০ টাকা নেওয়া হয়। তবে গ্রাহক নিজ অর্থে অনুমোদিত মিটার কিনে স্থাপন করলে এই চার্জ প্রযোজ্য হয় না বলে জানিয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলো।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা মিটার নষ্ট হলে প্রতিষ্ঠানই সেটি প্রতিস্থাপন করবে।
তবে ‘মিটার ভাড়া’ নাকি ‘মিটারের কিস্তি’—এ নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় একে অনেক ক্ষেত্রে মিটারের মূল্য কিস্তিতে আদায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যারা এককালীন মূল্য দেন, তাদের কাছ থেকে আর মাসিক কিস্তি নেওয়া হয় না।
তারপরও বাস্তবে বিল ও প্রিপেইড ব্যবস্থায় ‘মিটার রেন্ট’ শব্দটির ব্যবহার থাকায় গ্রাহকদের বড় অংশ এটিকে স্থায়ী ভাড়া হিসেবেই দেখছেন।
মিটারের দাম উঠে যাওয়ার পরও কি দিতে হবে?
গ্রাহকদের আরেকটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—মিটারের দাম যদি কয়েক বছরের মধ্যে মাসিক চার্জের মাধ্যমে উঠে যায়, এরপরও কেন চার্জ চলবে?
এ বিষয়ে এখনো একটি একক, সহজবোধ্য জাতীয় ব্যাখ্যা গ্রাহকদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছায়নি।
জুলাই পর্যন্ত বিইআরসি জানিয়েছিল, প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া প্রত্যাহারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি এবং বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ মিটার ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বর্তমানে এটি প্রযোজ্য চার্জের অংশ হিসেবেই কার্যকর রয়েছে।
প্রিপেইড মিটারেই কি বাড়তি টাকা কাটা হয়?
বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে—না।
তাদের বক্তব্য, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট পোস্টপেইড গ্রাহকের কাছ থেকেও নেওয়া হয়। পার্থক্য হলো টাকা আদায়ের সময়।
পোস্টপেইড ব্যবস্থায় মাস শেষে বিল হাতে পেয়ে গ্রাহক সব খাত দেখতে পান। প্রিপেইডে রিচার্জ করার সময়ই প্রযোজ্য চার্জ কেটে নেওয়া হয়। ফলে গ্রাহকের চোখে বিষয়টি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড গ্রাহক ব্যবহৃত বিদ্যুতের ওপর বর্তমানে ০.৫ শতাংশ রিবেটও পান।
অর্থাৎ প্রিপেইড মিটারে আলাদা ডিমান্ড চার্জ তৈরি করা হয়নি; পোস্টপেইডেও একই চার্জ রয়েছে। কিন্তু প্রিপেইডে অগ্রিম অর্থ থেকে সেটি কেটে নেওয়ায় গ্রাহকের কাছে ‘বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেই টাকা চলে যাচ্ছে’—এমন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।
তাহলে অসন্তোষ এত বেশি কেন?
গ্রাহকের ক্ষোভের পেছনে শুধু একটি কারণ নেই।
প্রথমত, জুন থেকে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবাসিক গ্রাহকের ৪০১-৬০০ ইউনিটের দাম এখন ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।
দ্বিতীয়ত, একই সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, মিটার চার্জ এবং ভ্যাট কাটা হওয়ায় রিচার্জ করা অর্থের একটি অংশ শুরুতেই কমে যায়।
তৃতীয়ত, এসব চার্জের হিসাব সম্পর্কে বহু গ্রাহকের পরিষ্কার ধারণা নেই।
চতুর্থত, লোডশেডিং চলার সময়ও ডিমান্ড চার্জ দিতে হওয়ায় ‘যে সেবা পুরোপুরি পাচ্ছি না, তার জন্য কেন পুরো অর্থ দেব’—এই প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
এ কারণেই নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটারবিরোধী আন্দোলন, সভা ও প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে।
প্রযুক্তির সমস্যা, নাকি আস্থার সংকট?
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, প্রিপেইড মিটারের কারিগরি ব্যবস্থায় সমস্যা পাওয়া যায়নি। সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির যাচাইয়েও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েনি বলে বিইআরসি জানিয়েছে।
বিতরণ সংস্থাগুলোর যুক্তি, প্রিপেইড মিটার বরং বিলের স্বচ্ছতা বাড়ায়, মিটার রিডিংয়ের ভুল কমায় এবং গ্রাহককে নিজের খরচ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়—এটি আস্থার সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
একজন গ্রাহক যখন ৫০০ টাকা রিচার্জ করেন এবং দেখেন পুরো অর্থ মিটারে যোগ হয়নি, তখন কেন কোন খাতে কত টাকা কাটা হলো—সেই তথ্য সহজ ভাষায় তাৎক্ষণিকভাবে না পেলে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এ কারণেই স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে প্রিপেইড মিটারের বিলিং, ডিমান্ড চার্জ ও অন্যান্য কর্তনের নিয়মিত অডিট এবং ফলাফল প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মূল প্রশ্নটা তাহলে কোথায়?
ডিমান্ড চার্জ বা মিটার চার্জ বিশ্বের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একেবারে অস্বাভাবিক ধারণা নয়। অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা, মিটার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কোনো না কোনোভাবে গ্রাহকের ট্যারিফেই যুক্ত হয়।
বাংলাদেশে বিতর্কটা মূলত তিন জায়গায়—
প্রথমত, গ্রাহকের কাছ থেকে যে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত ব্যয়ভিত্তিক হিসাব কতটা স্বচ্ছ?
দ্বিতীয়ত, লোডশেডিংয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ ডিমান্ড চার্জ নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
তৃতীয়ত, মিটার স্থাপনের খরচ আদায় হয়ে যাওয়ার পরও মাসিক চার্জের কাঠামো কী হবে?
বিইআরসি বলছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং জুনে বিদ্যুতের মূল্য বাড়লেও এই চার্জ বাড়ানো হয়নি।
কিন্তু গ্রাহকের অসন্তোষ বলছে, শুধু চার্জের হিসাব ঠিক থাকাই যথেষ্ট নয়; মানুষকে সেটি বোঝানো এবং চার্জের বিনিময়ে প্রত্যাশিত মানের সেবা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি শুধু মাসে ৪০ টাকা মিটার ভাড়া কিংবা কিলোওয়াটপ্রতি ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জের নয়—এটি গ্রাহক যে অর্থ দিচ্ছেন, তার বিনিময়ে কী পাচ্ছেন এবং সেই হিসাব কতটা স্বচ্ছ, সেই আস্থার প্রশ্ন।

