নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, বিশ্বনেতাদের সামনে বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে তিনি এই মঞ্চে জিয়া পরিবারের তৃতীয় বক্তা হিসেবে নাম লেখাবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম সাধারণ পরিষদের ভাষণ।
এই সফরের জন্য তিনি আগামীকাল সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ঢাকা ছেড়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হবেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের এই মঞ্চে জিয়া পরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। সে বছরের ২৬ আগস্ট শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথমবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর একই মঞ্চে বক্তব্য রাখেন তাঁর স্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া। দুজনের প্রথম ভাষণের মধ্যে ব্যবধান ছিল ১৩ বছরের। তারেক রহমানের ভাষণ হবে এই ধারার তৃতীয় অধ্যায়। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান।
জিয়াউর রহমানের ভাষণটি ছিল সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে। সেখানে তিনি ধনী ও গরিব দেশের মধ্যকার বাড়তে থাকা ফারাক নিয়ে কথা বলেন। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার তাগিদ দেন তিনি।
উন্নয়নের নানা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থাকার পরও কেন দারিদ্র্য ও ক্ষুধা রয়ে যাচ্ছে, সে প্রশ্নও তিনি তোলেন। শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বিশ্ব গড়ার আহ্বানও ছিল সেই ভাষণে। সেখানে দেশগুলোর পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে ভাষণ দেন সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে। পরে তিনি আরও কয়েকটি আয়োজনেও বক্তব্য রাখেন। এর মধ্যে ছিল ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারকসভা এবং ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন। ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের দুটি আলাদা সভাতেও তিনি কথা বলেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। ভাষণে গুরুত্ব পাবে এসব বিষয়:
- দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর
- আগামীর উন্নয়ন অগ্রাধিকার
- বৈশ্বিক শান্তি
- আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধান
- দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
- জলবায়ু মোকাবিলা ও জলবায়ু অর্থায়ন
এই সফরে রোহিঙ্গা সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবে।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আলাদা মাত্রা পেয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। ফলে অধিবেশনের নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশি থাকার সময়ে দেশের সরকারপ্রধান মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছেন। কূটনৈতিক বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের জন্য দৃশ্যমানতা বাড়ানোর একটি সুযোগ।
জাতিসংঘের প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২, ২৬ ও ২৮ সেপ্টেম্বর। সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিষয়টিকে প্রাথমিক সূচি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রথমত, এটি প্রতীকী দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। চার দশকের বেশি সময় ধরে একই পরিবারের তিন সদস্যের এই মঞ্চে কথা বলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক ধারাবাহিকতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তুর দিক থেকেও একটি মিল-অমিল চোখে পড়ে। জিয়াউর রহমান ধনী-গরিব ব্যবধান ও দারিদ্র্যের কথা বলেছিলেন। এবারের ভাষণেও দারিদ্র্য বিমোচন থাকছে। তবে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু অর্থায়ন ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো সমকালীন ইস্যু, যা এখনকার বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের মূল অবস্থানকে তুলে ধরে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য বাস্তব চাহিদার প্রশ্ন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে উন্নত দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সহায়তা চেয়ে আসছে। জাতিসংঘের মঞ্চে সরাসরি সরকারপ্রধানের মুখে এই দাবি উঠলে তার রাজনৈতিক ওজন বাড়ে।
চতুর্থত, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে। এটিকে প্রধান অগ্রাধিকারে রাখা মানে, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও টেকসই সমাধানের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরালো করার ইঙ্গিত।
পঞ্চমত, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা তুলে ধরা হবে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্বনেতাদের সামনে দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে উপস্থাপিত হয়, সেটি কূটনৈতিক মহলের নজরে থাকবে।
সবকিছু মিলিয়ে, এই ভাষণ শুধু একটি পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা নয়। এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক পরিসরে জানিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগও বটে।

