দেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৪ হাজার ৬০২টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০টির বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ২৫৪ শিশু।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এক হাজারের বেশি ছিল। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১টি, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫টি, এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি, মে মাসে ১ হাজার ৯৫২টি, জুনে ২ হাজার ২০০টি, জুলাইয়ে ২ হাজার ৩৩৬টি এবং আগস্টে ২ হাজার ১৫৬টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, বরং নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের মুঠোফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের লালমাই পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এর আগে সিলেটে শিশু ফাহিমা নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আদালত প্রতিবেশী জাকির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
এছাড়া ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার তথ্য উঠে আসে। এ মামলায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সামগ্রিকভাবে শিশুদের নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সহিংসতায় নিহত ২৫৪ শিশুর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। একই সময়ে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরাও মোট নিহতের প্রায় ২৯ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু কিশোর-কিশোরী নয়, একেবারে ছোট শিশুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার সংখ্যা বেশি হওয়ার অর্থ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তার মতে, শুধু ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নিলে অপরাধ কমানো কঠিন। ঝুঁকির কারণগুলো চিহ্নিত করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আট মাসে ১৪ হাজার ৬০২টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ২৫৪ শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে।
তিনি বলেন, অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। তাই প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। কোথায় এবং কেন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে হবে।
পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি নির্যাতনের ঘটনা গোপন না রেখে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। আট মাসের পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

