ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ১১ মাস পার হলেও আমদানি পণ্য খালাসের স্বাভাবিক গতি ফেরেনি। আগে যেখানে খালাসের অপেক্ষায় থাকা পণ্য থাকত ১০০ টনের কিছু বেশি, এখন তা বেড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টনে ঠেকেছে। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও ব্যবসায়ীরা জানান, জমে থাকা কিছু পণ্য রাখতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। স্ক্যানার অচল, গুদাম অস্থায়ী ব্যবস্থায় চলছে, আর ছুটির দিনে খালাস প্রায় থমকে যায়। এসব কারণে পণ্যজট কাটছে না।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের আগে বিমানবন্দরে সাধারণত ১০০ টনের বেশি পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকত। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে এখন এই পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ টন।
তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবরের আগুনের পর জমে থাকা পণ্য ছিল ২ হাজার টনের বেশি। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো। কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ টন আমদানি পণ্য আসে। কোনো কোনো দিন তা ৩০০ টনে নামে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জট বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট করছে। ভবিষ্যতে আমদানি-রপ্তানি বাড়লে সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে। ব্যবসায়ী ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের মতে, খালাস ধীর হওয়ার প্রধান কারণ পাঁচটি:
- পণ্য খালাসে সময়ক্ষেপণ
- সাপ্তাহিক ছুটিতে কার্যক্রম বন্ধ থাকা
- গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সমস্যা
- পণ্য স্ক্যানিংয়ের সীমিত সক্ষমতা
- গুদাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএএবি) সভাপতি কবির আহমেদ ব্যাখ্যা করেন, কোনো চালান আসার দিনই খালাস না হলে সেটি “লেফট-ওভার” বা জমে থাকা কার্গোতে পরিণত হয়। খালাসের জন্য নানা সনদ ও কাগজপত্র লাগে। এগুলো জমা বা প্রক্রিয়া করতে দেরি হলে পণ্যও আটকে যায়।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়েও সমস্যা আছে। তাঁর ভাষ্য, বিমান অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাসের জন্য হাজির করতে পারে না। আবার গুদামে পণ্য কোথায় রাখা হয়েছে, তা খুঁজে পেতেও সময় লাগে। গুদামের কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অস্থায়ী ব্যবস্থায় কাজ চলছে।
কবির আহমেদের প্রস্তাব, কার্গো কার্যক্রমকে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে যুক্ত একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি বিমান, কাস্টমস ও অন্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো দরকার। বিমানবন্দর দিনরাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। কিন্তু শুক্র, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে খালাসের গতি অনেক কমে যায়। কারণ এসব দিনে বহু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কাজ করেন না।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগিব সামাদ জানান, ছুটির দিনেও ফ্লাইট ও পণ্য আসা চলতে থাকে। কিন্তু খালাস কম হওয়ায় পণ্য জমে যায়। সেগুলো পরের কর্মদিবসগুলোতে সামলাতে হয়। তিনি আরও জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি অংশ গত জানুয়ারির দিকে আমদানি পণ্য রাখার উপযোগী করা হয়েছে। এখন সেখানেই পণ্য রাখা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, আমদানিকারক ও এজেন্টরা ছুটির দিনেও কাজ করলে চাপ কমবে। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের বক্তব্য ভিন্ন। ছুটির দিনে কাজ করতে বাড়তি জনবল ও খরচ লাগে। তাই তাঁদের উৎসাহিত করতে প্রণোদনা, ছাড় বা বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হতে পারে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আমদানিকারকেরা ইচ্ছা করে পণ্য ফেলে রাখেন না। এত টাকা খরচ করে পণ্য আনার পর কাস্টমসের সহযোগিতার অভাব ও নানা জটিলতায় অনেক সময় দ্রুত খালাস করা যায় না। রাগিব সামাদ মনে করেন, সাত দিনের মধ্যে খালাস না হওয়া পণ্য নিয়ে কাস্টমসের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের পর খালাস না হলে সেই পণ্য বিক্রির জন্য একটি আইনি কাঠামো গড়ে তোলার কথাও তিনি বলেন।
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, আগুনের আগে মূল কার্গো এলাকায় দুটি স্ক্যানার ছিল। একটি সচল ছিল, অন্যটি আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। আগুনের পর দুটিই অকেজো হয়ে যায়। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চারটি নতুন মেশিন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, স্ক্যানারের ঘাটতিই জটের মূল কারণ নয়। তিনি বলেন:
- প্রায় ৮০ শতাংশ চালান এক দিনের মধ্যেই গুদাম থেকে বের হয়ে যায়।
- আগুনের আগেও পণ্য জমত, কারণ আমদানিকারক ও এজেন্টদের সব পণ্য একসঙ্গে সরানোর সক্ষমতা থাকে না।
- অনেক কারখানা বন্ধ থাকে এবং নিজেদের গুদামে পণ্য রাখতে পারে না। তাই তারা কর্মদিবসেই পণ্য নেয়।
- আগে আমদানি কার্গো গুদাম পুরো সচল ছিল। এখন সেটি সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে চলছে।
বিমানের মুখপাত্র মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কার্গোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাঁর আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্ক্যানার না থাকায় যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই পণ্য ছাড় হচ্ছে, এই ধারণা কামরুল হাসান নাকচ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করতে কর্মকর্তারা কাগজপত্র যাচাই করেন। প্রয়োজনে সরাসরি পণ্য খুলে পরীক্ষাও করেন। তবে তিনি মানেন, আধুনিক স্ক্যানার থাকলে প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হতো। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, পণ্য বেশি হলে সরাসরি পরীক্ষায় অনেক সময় লাগে। তাঁরা ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষার পাশাপাশি আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি চান।
আইএএবির তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টন রপ্তানি পণ্য সামলাতে হয়। এটি সর্বোচ্চ নয়, আবার খুব কমও নয়। এই মাঝারি পরিমাণের কারণে অবকাঠামোর ঘাটতি এখনো বড় চাপ তৈরি করেনি। কিন্তু রপ্তানি বাড়লে স্ক্যানিং ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হবে।
বিমানবন্দর কর্মকর্তারা জানান, রপ্তানি পণ্য স্ক্যানের জন্য চারটি এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) মেশিন আছে। এর মধ্যে সচল মাত্র দুটি, ইডিএস-১ ও ইডিএস-৩। ইডিএস-২ কয়েক বছর ধরে অচল। ইডিএস-৪ অচল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালক আব্দুল করিম মোল্লা জানান, একটি ইডিএস মেশিন মেরামতে কয়েক কোটি টাকা লাগে। সচল দুটি মেশিনেই এখনকার রপ্তানি পণ্য সামলানো যাচ্ছে। তাই কর্তৃপক্ষ আপাতত নতুন মেশিন কেনা বা পুরোনো মেশিন মেরামতের পরিকল্পনা করছে না।
রাগিব সামাদের আশা, তৃতীয় টার্মিনালের নতুন আমদানি কার্গো সুবিধা এবং সংযুক্ত আমদানি-রপ্তানি টার্মিনাল চালু হলে জট কমবে। তখন বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো সক্ষমতা ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৪৬ হাজার টনে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। কার্গোর জন্য সেখানে ৩৬ হাজার বর্গমিটার জায়গা থাকবে।
বিশ্লেষণ: প্রথমত, আগুনের ধাক্কা এখনো কাটেনি। আমদানি কার্গো গুদাম এখন সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশে চলছে। জায়গা কম হলে জট বাড়ে, এটাই স্বাভাবিক। জমে থাকা পণ্য ২ হাজার টন থেকে কমলেও আগের ১০০ টনের স্তরে ফেরেনি।
দ্বিতীয়ত, দায় নিয়ে মতভেদ আছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, আমদানিকারক ও এজেন্টদের দেরি এবং ছুটির দিনের কাজ না করা বড় কারণ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাস্টমসের সহযোগিতার অভাব, কাগজপত্রের জটিলতা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সমস্যাই আসল বাধা। সম্ভবত সব কটি কারণই কিছু না কিছু ভূমিকা রাখছে। তাই এককভাবে কাউকে দায়ী করলে সমাধান মিলবে না।
তৃতীয়ত, সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। বিমান, কাস্টমস, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক, এতগুলো পক্ষ এক শৃঙ্খলে কাজ করে। একটি জায়গায় দেরি হলে পুরো ধারা আটকে যায়। সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থার প্রস্তাব এখানেই প্রাসঙ্গিক।
চতুর্থত, স্ক্যানার জরুরি হলেও একমাত্র সমাধান নয়। কাস্টমসের নিজের হিসাবেই ৮০ শতাংশ চালান এক দিনে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ বাকি ২০ শতাংশ চালান জটের বড় অংশ তৈরি করছে। সেগুলোর কাগজপত্র, মালিকের সক্ষমতা ও ছুটির দিনের কার্যক্রম, এসব দিকে আলাদা নজর দরকার। তবে নতুন স্ক্যানার এলে সরাসরি পরীক্ষার চাপ কমবে, এটাও ঠিক।
পঞ্চমত, রপ্তানি খাতে সুপ্ত ঝুঁকি। চারটির মধ্যে দুটি ইডিএস মেশিন অচল। এখন কাজ চললেও পণ্য বাড়লে সমস্যা হবে। কর্তৃপক্ষ অগ্রিম প্রস্তুতি না নিলে ঝুঁকি বাড়বে।
ষষ্ঠত, সময়সীমার অনিশ্চয়তা। ডিসেম্বরে স্ক্যানার আসার কথা ‘আশা’ হিসেবে বলা হয়েছে, নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়। তৃতীয় টার্মিনালের চালুর নির্দিষ্ট তারিখও জানানো হয়নি। তাই স্বল্প সময়ে জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: বিমানের মুখপাত্র এখনো কার্গো পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। ফলে প্রতিবেদনে বিমানের পক্ষের ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। সব মিলিয়ে, আগুনের প্রায় এক বছর পরও শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। স্বল্পমেয়াদে গুদামের সক্ষমতা, ছুটির দিনের কার্যক্রম ও সংস্থাগুলোর সমন্বয় ঠিক করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে নতুন স্ক্যানার ও তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়াই আসল পরীক্ষা। আমদানি-রপ্তানি বাড়ার আগেই এসব প্রস্তুতি শেষ না হলে ব্যবসা ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে।

