প্রাণ এখন সস্তা, বিচার এখন দুর্লভ। খুলনায় আজমল, কুমিল্লায় অপ্রতিম
শুক্রবার রাতে খুলনার একটি মেসের ছাদে একটা “বিচার” বসেছিল। বিচারক ছিল মেসের কয়েকজন সহবাসী ও বহিরাগত। আসামি আজমল হোসেন। তিনি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র, ভর্তি হয়েছিলেন মাত্র ১০ দিন আগে। অপরাধ, মিল না দিয়ে মেস-ম্যানেজারের রান্না করা ভাত খেয়ে ফেলা। রায় হলো মৃত্যু। আপিলের সুযোগ ছিল না, উকিল ছিল না। ছিল কেবল একটা ছাদ আর একদল উন্মত্ত হাত।
ছাদে মারধরের পর রাত পৌনে ১টার দিকে আজমলকে গলিতে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল, দুই পা-ও ভাঙা। যাঁরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর খবর পেতেই তাঁরা সেখান থেকে সরে পড়লেন। বিপদে পাশে থাকার সংস্কৃতিও তবে মৃত!
ভাতের দাম, মুক্তিপণের দাম
আজমলের বাবার ভাষ্য, রাত ৯টায় ছেলে ফোনে বলেছিল সে ভালো আছে, চিন্তা করতে হবে না। রাত ১২টার পর ছেলের ফোন থেকে একজন কল করে জানায়, ছেলে “ঝামেলা” করেছে, ফিরে পেতে চাইলে এক লাখ টাকা লাগবে। যে রাতে ছেলের ফোন থেকে টাকা চাওয়া হলো, সেই রাতেই ছেলের লাশ হাসপাতালে। এক থালা ভাতের সঙ্গে এক লাখ টাকার এই যোগ-বিয়োগ শুধু নির্মমতা নয়, নির্লজ্জতারও চূড়ান্ত।
মেসের কাজের বুয়া নাকি বলেছেন, আজমলের বিরুদ্ধে আগেও টাকা-ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ উঠেছিল। ধরে নিলাম উঠেছিল। তাতে কী? চুরির বিচার কি ছাদে হয়? আইন কি এখন মেস-ম্যানেজারের হাতে?
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে এজাহারভুক্ত করে এবং আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়েছে। একজন মানুষকে মারতে যদি এত হাত লাগে, তবে আমরা কোন মুখে বলি যে এ জাতির ঐক্য নেই!
আজমলের বাবা বলেছেন, তিনি কারও কাছে বিচার চাইবেন না, কারণ তাঁর বিশ্বাস, তাঁরা বিচার পাবেন না। এই একটি বাক্য রাষ্ট্রের গালে যত জোরে চড় মারে, একশো সমাবেশও তা পারে না। একজন বাবা বিচার চাওয়ার আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এ পরাজয় আজমলের বাবার নয়, রাষ্ট্রের।
অপ্রতিম: ১৩ বছরের শৈশবের প্রাণের দাম ?
খুলনার ছাদ থেকে চোখ সরাতে না সরাতেই কুমিল্লার জঙ্গল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ১৩ বছরের অপ্রতিম শুক্রবার দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। সে আর ফেরেনি। নিখোঁজের একদিন পর জঙ্গলে তার মরদেহ মিলেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছে। পুলিশের দাবি, দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হত্যা। পুলিশের ভাষ্য সত্য হলে প্রশ্নটা আরও ভয়ংকর। একটি মুঠোফোনের দাম কি একটি শিশুর জীবন? যে সমাজে ১৩ বছরের শিশুর প্রাণ একটি ফোনের চেয়েও সস্তা, সেই সমাজকে “সভ্য” বলার লজ্জা কার? অপ্রতিমের মা কাঁদতে কাঁদতে জানতে চেয়েছেন, এটা কোন দেশ। উত্তর দেওয়ার দায় আমাদের সবার, আগে রাষ্ট্রের।
এটা “ঘটনা” নয়, নিয়ম
আজমল আর অপ্রতিম ব্যতিক্রম নন। এটাই এখন নিয়ম।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ৬৭ জন। অর্থাৎ মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপি বাড়ানোর গল্প আমরা শুনি, লাশ বাড়ানোর হিসাব কেউ দেয় না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মব হামলায় ১৫৪ জন নিহত হয়েছেন, শুধু ঢাকাতেই ৫৭ জন। ২০২৫ সালে পুরো বছরে নিহত হয়েছিলেন ১৯৮ জন। আট মাসেই আগের পুরো বছরের কাছাকাছি।
সম্প্রতি মহেশখালিতে চুরির অপবাদে এক ব্যক্তিকে বিদ্যুতের খুঁটিতে পিছমোড়া করে বেঁধে, পিঠে ইট চাপিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহে তোফাজ্জলকে পিটিয়ে মারার স্মৃতিও পুরোনো হয়নি। জায়গা বদলায়, অপবাদ বদলায়, শুধু বদলায় না একটা জিনিস: বিচার হয় না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একসময় ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে কোনো রকমের মব কালচার আর থাকবে না। ঘোষণা আছে, মবও আছে। নেই শুধু কোনো দৃষ্টান্তমূলক পরিণতি। অনেকে ভেবেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতাই মব সন্ত্রাসের কারণ, নির্বাচিত সরকার এলে তা কমবে। পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা। যে অপরাধে শাস্তি নেই, সে অপরাধের বাজার ফুলেফেঁপে ওঠে। এটাই অর্থনীতির সহজ সূত্র।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন
আজমল হত্যা মামলার সব আসামিকে, নামোল্লেখিত ও অজ্ঞাতনামা, কবে গ্রেপ্তার করা হবে? অপ্রতিম হত্যার বিচার কি দ্রুত নিষ্পত্তির পথে যাবে, নাকি আরেকটা “সময়ের অপেক্ষা”য় হারিয়ে যাবে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কবে বুঝবে, শিক্ষার্থীরা যেখানে থাকে, সেখানকার নিরাপত্তার দায়ও তাদের? যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ভর্তি করা শিক্ষার্থী সম্পর্কে কোনো তথ্যই ছিল না, সে কীসের অভিভাবক?
মেসে ভাতের হিসাব রাখা যায়। রাষ্ট্র কি পারে না অন্তত লাশের হিসাবটুকু রাখতে? মেসের হিসাব মেলাতে গিয়ে যারা একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল, রাষ্ট্র যেন তাদের কাছ থেকে সেই হিসাব বুঝে নেয়। নইলে আজমল-অপ্রতিমের পরের নামটা আপনার, আমার, বা আমাদের কোন আপনজনের হতে কতক্ষণ?

