কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩ বছরের এক কিশোরের মরদেহ পাওয়া গেছে। তার নাম ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে শিশু নিরাপত্তার উদ্বেগজনক চিত্র। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কারও লাশ মিলেছে মাটির নিচে, কারও নদীতে।
শনিবার কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ছেলেকে হারিয়ে মা নাহিদা বেগম আহাজারি করছেন। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। তার বাসা থেকে একটি আইফোন উদ্ধারের খবরও পাওয়া গেছে।
আসক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করে। তাদের হিসাবে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে রয়েছে নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনা।
নিহতদের বিভাজন এমন:
- শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু: ৬৮ জন
- পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে মৃত্যু: ৪৯ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা: ২৬ জন (এর মধ্যে দুজন ছেলেশিশু)
- ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা: ৪ জন
- গুলিতে মৃত্যু: ৩ জন
- গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনে মৃত্যু: ২ জন
- উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা: ২ জন
- অপহরণের পর হত্যা: ১ জন
এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের আরও ৯৯টি ঘটনা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু হত্যার তালিকাই নয়, অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যাও বড়।
কিছু ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে পরিচিত ব্যক্তিদের দিকে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু ১০ সেপ্টেম্বর স্কুলে গিয়ে আর ফেরেনি। দুই দিন পর, ১২ সেপ্টেম্বর, তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝের নিচে মাটিচাপা অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাবনা সদরে ১০ বছরের এক শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর, একটি ডোবা থেকে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের ভাষ্য, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায়ও দুজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
পরিবারের সঙ্গে প্রাণ হারানো শিশু: সাম্প্রতিক চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মোট সাতটি শিশু নিহত হয়েছে:
- লক্ষ্মীপুরের রায়পুর (২৫ জুন): ভাড়া বাসায় ঢুকে এক মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মেয়েদের বয়স ছিল ১০, ১৭ ও ২১ বছর।
- রংপুর (আগস্ট): অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন হয় ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ।
- মাদারীপুরের শিবচর (আগস্ট): এক নারীর লাশ পাওয়ার পাঁচ দিন পর, ২৪ আগস্ট, নদী থেকে তাঁর এক বছরের সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের ভাষ্য, মা ও শিশু দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে।
- সুনামগঞ্জের তাহিরপুর (১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত): একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে মামলা হয়েছে ২৯৫টি। এই বড় চিত্রের মধ্যেই শিশুদের ওপর সহিংসতা আলাদা উদ্বেগ তৈরি করছে।
নিখোঁজ শিশুর সংখ্যাও কম নয়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এ নিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাতে বলা হয়, প্রথম সাত মাসে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ১৫ হাজার ৭১৭। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যা ৮৭ শতাংশের বেশি। তবে এখনো নিখোঁজ আছে ২ হাজার ৩৮ শিশু। এটি মোট সংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ ও ইউনিসেফের বক্তব্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল এসব অপরাধ নিয়ে খোঁজখবর রাখেন। তিনি শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এমন নৃশংসতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের। তাঁর প্রশ্ন, শিশুদের নিরাপদ জায়গা তাহলে কোথায়। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকা, কোথাও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে।
অধ্যাপক ইকবালের মতে, এ ধরনের সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতা থাকতে পারে। প্রতিশোধ কিংবা পারিবারিক বিরোধও কারণ হতে পারে। অনেক সময় বড়দের বিরোধ ও হিংসার শিকার হচ্ছে শিশুরা। তিনি মনে করেন, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে মানুষের সচেতনতা বাড়বে এবং অপরাধ কমাতেও সহায়তা মিলবে।
এর আগে ২২ মে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান চেয়েছিলেন। তাঁর আহ্বান ছিল ঘর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সব জায়গায় শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইউনিসেফ আরও কয়েকটি ঘাটতির কথা তুলে ধরে:
- অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থার অভাব
- শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়ার সংকট
- স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা সেবার দুর্বলতা
- মানসিক ও সামাজিক সহায়তার অভাব
সংস্থাটি স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর কথাও বলেছে।
বিশ্লেষণ: সমস্যার মূল কোথায়: প্রথমত, ঝুঁকি বহুমুখী। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, শুধু অপরিচিত ব্যক্তি নয়, ঘর ও পরিচিত পরিবেশেও শিশু ঝুঁকিতে আছে। নির্যাতনে নিহত শিশুদের বড় অংশ পারিবারিক পরিসরের ঘটনার শিকার। তাই শুধু রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা বাড়ালে সমস্যার সমাধান হবে না।
দ্বিতীয়ত, নিখোঁজের প্রথম কয়েক দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জামালপুর ও পাবনার ঘটনায় শিশুরা কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। দ্রুত অনুসন্ধান ও সমন্বিত পুলিশি তৎপরতা এখানে প্রাণ বাঁচাতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিসিটিভির ভূমিকা অপ্রতিম হত্যার ঘটনাতেও দেখা গেছে।
তৃতীয়ত, উদ্ধারের হারের আড়ালে বড় সংখ্যা। ৮৭ শতাংশ উদ্ধারের তথ্য ইতিবাচক মনে হলেও অবশিষ্ট ২ হাজার ৩৮ শিশুর খোঁজ এখনো মেলেনি। এত বড় সংখ্যা উপেক্ষা করার মতো নয়। এদের পরিণতি কী হয়েছে, তা জানা জরুরি।
চতুর্থত, বিচারের গতি ও দৃষ্টান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বিচার অপরাধীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়। ইউনিসেফও দায়মুক্তির অবসান চেয়েছে। বিচার দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীর মধ্যে ভয় কমে যায়।
পঞ্চমত, সচেতনতা ও সামাজিক দায়। অভিভাবক, স্কুল ও প্রতিবেশীর সতর্কতা ছাড়া শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে শিশু সুরক্ষা সম্ভব নয়। পারিবারিক বিরোধ যেন শিশুর ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।
একটি সীমাবদ্ধতা: আসকের পরিসংখ্যান গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা ভিন্ন হতে পারে। তবে প্রবণতা বোঝার জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, একের পর এক ঘটনা একটি প্রশ্নই সামনে আনছে: শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত হবে। দ্রুত অনুসন্ধান, কার্যকর বিচার, শিশুবান্ধব সেবা ও সামাজিক সচেতনতা, এই চারটি ক্ষেত্রেই জোরালো পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

