সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। নতুন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। ফলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়তি বেতনের বকেয়া চলতি মাসের বেতনের সঙ্গে পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে। তবে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে।
‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামের প্রজ্ঞাপনটি গত বৃহস্পতিবার জারি হয়। শনিবার তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন পায়।
নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হয়েছে। বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে যাঁরা সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তাঁরা এই গ্রেডে বেতন পান। সর্বোচ্চ পর্যায়ে, অর্থাৎ প্রথম গ্রেডে, মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই গ্রেডে বেতন পান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের বেতন হবে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। জ্যেষ্ঠ সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তারা পাবেন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বেতনের সঙ্গে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধাও বাড়ছে।
এর আগে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে। তখন সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ৯৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১ শতাংশ বেড়েছিল। সেটিই তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ছিল। এবারের বৃদ্ধি তার চেয়েও বেশি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাড়তি বেতন কার্যকর হবে চারটি ধাপে। ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তার ওপরের গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তার ওপরের গ্রেডের কর্মকর্তারা পাবেন ৭০ শতাংশ। ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পাবেন ৭৫ শতাংশ। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। মূল বেতনের সঙ্গে যেসব ভাতা দেওয়া হয়, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। গত ৩০ জুন কর্মচারীরা যে বেতন পেয়েছেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে বাড়তি প্রাপ্য হিসাব করা হবে।
নতুন কাঠামোয় এলাকা ও গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়ার হারও নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত পাবেন ৫০ শতাংশ। গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত কর্মকর্তারা পাবেন ৪৫ শতাংশ। গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তার ওপরের গ্রেডের কর্মকর্তারা পাবেন ৪০ শতাংশ। খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় বাড়ি ভাড়ার হার কিছুটা কম।
বর্তমান ব্যবস্থায় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলে বাড়ি ভাড়া মেলে ৬৫ শতাংশ হারে, ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা। ৯ হাজার ৭০১ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে হার ৬০ শতাংশ, ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা। ১৬ হাজার ১ থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে হার ৫৫ শতাংশ, ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা। ৩৫ হাজার ৫০১ টাকার বেশি মূল বেতনে হার ৫০ শতাংশ, ন্যূনতম ১৯ হাজার ৫০০ টাকা।
অবসরভোগীদের পেনশনও বাড়ছে পাঁচ ধাপে। যাঁরা অনেক আগে অবসরে গেছেন এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। মাসে নিট ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পেলে বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেলে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেলে ৬০ শতাংশ। আর ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেলে ৫৫ শতাংশ। বেতন কাঠামোতে বলা হয়েছে, এর ফলে মাসিক পেনশন সর্বনিম্ন ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়াবে।
তবে একটি ভাতা কমেছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এখন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা ৫ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই ভাতা কর্মচারীদের পাশাপাশি মাসিক নিট পেনশনভোগী ও আজীবন পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্তরাও পাবেন। শেষোক্তদের ক্ষেত্রে মূল পেনশনভোগীর নিট পেনশনকে ভিত্তি ধরা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ সরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতার ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে সেই চাপ কিছুটা সহনীয় থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

